দেশের শীর্ষ মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এ বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান।
এ লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে নগদের একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে গভর্নরের সঙ্গে তার একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যারিস্টার আরমান হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে। ২০১৬ সালে তিনি গুমের শিকার হন এবং টানা আট বছর তথাকথিত ‘আয়নাঘর’-এ আটক ছিলেন।
পরবর্তীতে জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তি পান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। নির্বাচনে দাখিল করা হলফনামায় তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছিল।
নগদে বিনিয়োগে তার আগ্রহ রাজনৈতিক ও আর্থিক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে গভর্নর বরাবর বিনিয়োগসংক্রান্ত চিঠি দেওয়াকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, বড় ধরনের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠান—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তবে ব্যারিস্টার আরমান দাবি করেছেন, তার পরিচিত কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারী মূলত এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী। গত ৮ ফেব্রুয়ারি গভর্নরের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি ‘নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস’ প্রসঙ্গে দেওয়া সময় ও পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
চিঠিতে উল্লেখ করেন, তার অনুরোধেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেখানে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স পাওয়ার বিষয়ে সহায়তা চাওয়া হয়েছিল।
দেশের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রভাবশালী আর্থিক সেবা গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য বলে তিনি জানান। এ উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার আলোচনা হয়েছে এবং তারা বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বৈঠকে তিনি জানতে পারেন যে নগদ পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রয়েছে। প্রয়োজনীয় ডিউ ডিলিজেন্স শেষে এটি নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি অবগত হন। এমন সুযোগ পেলে সেটিকে তিনি নিজের জন্য বড় সম্মান ও সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
গভর্নরের কাছে দেওয়া চিঠিতে ব্যারিস্টার আরমান উল্লেখ করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক মূল্যায়ন শেষে পরবর্তী ধাপে যেতে প্রস্তুত। এর অংশ হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে নগদের আর্থিক, পরিচালনাগত ও ব্যবসায়িক অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ ও সমন্বিত ধারণা পাওয়া যায়।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের শক্তি, দুর্বলতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এ প্রেক্ষিতে ফরেনসিক অডিট পরিচালনার অনুমতি পেতে তিনি গভর্নরের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নগদের মালিকানা হস্তান্তরসংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি অবগত নন। পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত হলে তা তার জানার কথা। তবে এখন পর্যন্ত গভর্নর বা অন্য কেউ তাকে এ বিষয়ে কিছু জানাননি। তার মতে, বিষয়টি হয়তো এখনো প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে।
নগদের মালিকানা হস্তান্তরের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হলে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করতে হবে এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ দরদাতাই মালিকানা পাবে। টেন্ডার ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি মালিকানা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ব্যারিস্টার আরমান নগদের মালিকানা পেলে বিনিয়োগের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় গুম থাকার পর হঠাৎ বড় আকারের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখালে অর্থের উৎস, আইনি বৈধতা ও নীতিগত বিষয় নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তার যে কোনো বিনিয়োগই জনআলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। তাই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম বিবেচনায় বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও নগদ সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষ থেকে নগদের মালিকানায় যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব এসেছে। আবার অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন আগ্রহী পক্ষকে মালিকানায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তাবই চূড়ান্ত হয়নি। নগদের বর্তমান বাজারমূল্যও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বখ্যাত অডিট প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির মাধ্যমে নগদের সম্পদের মান যাচাইয়ে একটি ফরেনসিক নিরীক্ষা করিয়েছে।
নগদ সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নগদের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে মালিকানা গ্রহণ বা নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। সেখানে নির্বাচনি হলফনামা অনুযায়ী ব্যারিস্টার আরমানের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি টাকা হওয়ায় তার বিনিয়োগ আগ্রহ নিয়ে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নগদের মালিকানা হস্তান্তর নিয়ে যেসব আলোচনা চলছে, তার আইনি ভিত্তি এখনো স্পষ্ট নয়।
কারণ প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ শেয়ার বর্তমানে ‘নগদ লিমিটেড’-এর নামে রয়েছে এবং ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় রয়েছেন পলাতক আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
সেক্ষেত্রে প্রথমে শেয়ার সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সরকার বা ডাক বিভাগ পূর্ণ মালিকানা অর্জন করার পরই কেবল তৃতীয় পক্ষের কাছে মালিকানা হস্তান্তরের প্রশ্ন উঠতে পারে।

































