শীত এলেই অনেক মানুষেরই সকালে ঘুম ভাঙতে দেরি হয়, বিছানা ছাড়তে মন চায় না, আর সারাদিন একটা অদ্ভুত ঝিমুনি বা ক্লান্তি লেগে থাকে। অন্য ঋতুতে যেখানে “ঘুম ঠিকমতো হয়নি” এমন অনুভূতিটা তেমন প্রকট হয় না, সেখানে শীতকালে এই সমস্যাটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আপনার যদি এমনটা মনে হয়, তাহলে ভাবার কিছু নেই—আপনি একা নন। বিশ্বের অসংখ্য মানুষ শীত মৌসুমে ঠিক একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। চিকিৎসক ও ঘুম–বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের ঘুমের চাহিদাও স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়।
শীতকালে কেন বেশি ঘুম আসে?
মানবদেহে একটি প্রাকৃতিক জৈবঘড়ি বা ‘বডি ক্লক’ রয়েছে, যা মূলত সূর্যের আলো–অন্ধকারের ওপর ভিত্তি করে আমাদের ঘুম ও জাগরণের সময় নির্ধারণ করে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো থাকলে শরীর থাকে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়, আর সন্ধ্যার পর আলো কমে গেলে ধীরে ধীরে ক্লান্তি ভর করে।
শীতকালে দিনের আলো কম থাকে এবং অন্ধকারের সময় দীর্ঘ হয়। এর ফলে শরীরে মেলাটোনিন নামের হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই হরমোন ঘুম আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঠান্ডা আবহাওয়ায় মেলাটোনিন উৎপাদনের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত শুরু হয়, যার কারণে সন্ধ্যা নামতেই ঘুম ঘুম ভাব চলে আসে।
শুধু ঘুম আসাই নয়, শীতকালে ঘুমের মানেও পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘ সময় অন্ধকার থাকার কারণে শরীর সারা বছরের জমে থাকা ঘুমের ঘাটতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
গভীর ঘুম কেন বাড়ে?
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শীত মৌসুমে মানুষের গভীর ঘুমের সময় গড়ে প্রায় ৩০ মিনিট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই গভীর ঘুম মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় স্মৃতিশক্তি উন্নত হয়, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে, মানসিক চাপ কমে এবং মেজাজ ভালো থাকে। একই সঙ্গে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও শক্তিশালী হয়।
গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশেষভাবে সক্রিয় থাকে এবং তখনই মূলত স্বপ্ন দেখা হয়। শরীর ও মনের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার বড় একটি অংশ এই সময়েই সম্পন্ন হয়, যা সার্বিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
ঋতুভেদে ঘুমের অভ্যাস বদলানো দরকার
গবেষকদের মতে, এসব তথ্য থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—ঘুমের অভ্যাস ঋতু অনুযায়ী সামান্য হলেও বদলানো উচিত। বিশেষ করে শীতকালে একটু আগেভাগে ঘুমাতে যাওয়া শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।
যদিও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় সারা বছরই অনেকের ঘুমের সময় প্রায় একই থাকে, বাস্তবতা হলো শীতকালে মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ধীর হয়ে যায়। তখন শরীর অতিরিক্ত বিশ্রাম ও ঘুমের সংকেত দেয়।
শেষ কথা
শীতকালে বেশি ঘুম পাওয়া অলসতা, অক্ষমতা বা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক জৈব প্রতিক্রিয়া মাত্র। তবে যদি এই পরিবর্তন দৈনন্দিন কাজকর্মে অতিরিক্ত প্রভাব ফেলতে শুরু করে বা অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

































