বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বয়সের পার্থক্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, স্থায়িত্ব ও দাম্পত্য সুখে কতটা প্রভাব ফেলে—এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই আলোচিত। প্রেমের শুরুর দিকে বয়সের ফারাক খুব একটা গুরুত্ব পায় না।
ভালোবাসার আবেগে বয়স বড় না ছোট—এসব তখন তেমন চোখেই পড়ে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব জীবন, দায়িত্ব ও প্রত্যাশার মুখোমুখি হলে বয়সের ব্যবধান নিয়ে নানা জটিলতা সামনে আসতে পারে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বয়সের পার্থক্য নিয়ে কিছু নির্দিষ্ট প্রবণতা ও ধারা রয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় কোন ধরনের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বয়সের ব্যবধান ও বিচ্ছেদের ঝুঁকি নিয়ে করা একাধিক প্রতিষ্ঠিত গবেষণায় দেখা গেছে, বয়সের পার্থক্য যত বাড়ে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও ধীরে ধীরে তত বাড়তে থাকে। সমবয়সী বা এক বছরের ব্যবধান থাকা দম্পতিরা সাধারণত কম ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। পাঁচ বছরের ব্যবধান থেকে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা বাড়তে শুরু করে। দশ বছর বা তার বেশি বয়সের পার্থক্য হলে সেই ঝুঁকি আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
এমনকি ২০ থেকে ৩০ বছরের ব্যবধান থাকলে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সের বড় ফারাক থাকলে জীবনের লক্ষ্য, সময়ের চাহিদা, অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি করে।
বয়সের ব্যবধান কি দাম্পত্য সন্তুষ্টিকে প্রভাবিত করে—এই প্রশ্নের উত্তরেও গবেষণায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণা বলছে, বয়সে বড় পার্থক্য থাকা দম্পতিরা সম্পর্কের শুরুতে তুলনামূলকভাবে বেশি সুখ ও উত্তেজনা অনুভব করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সন্তুষ্টি অনেক ক্ষেত্রেই কমতে থাকে। বিশেষ করে বয়সের ব্যবধান বেশি হলে জীবনধারার অমিল, সময়ের চাপ, শারীরিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওঠানামা সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এতে স্পষ্ট হয়, শুরুর আবেগ আর দীর্ঘমেয়াদি সুখ সব সময় এক নয়।
গবেষণাগুলো আরও ইঙ্গিত দেয়, বয়সে এক থেকে দুই বছরের পার্থক্য থাকলে দাম্পত্য জীবনের স্থায়িত্ব ও সন্তুষ্টি প্রায় সমবয়সী দম্পতিদের মতোই থাকে। তিন থেকে পাঁচ বছরের ব্যবধানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জীবনলক্ষ্য একসঙ্গে মিলিয়ে চলা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। আর দশ বছর বা তার বেশি বয়সের পার্থক্যে চাকরি, সামাজিক ভূমিকা, পারিবারিক দায়িত্ব, বন্ধু-বান্ধবের প্রত্যাশা এবং আর্থ-সামাজিক সময়কালের ভিন্নতার কারণে সমস্যার মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। তবে এসব তথ্য গড় ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি—বাস্তবে ব্যক্তিভেদে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে।
সমবয়সী দম্পতিদের ক্ষেত্রে সাধারণত সংস্কৃতি, স্মৃতি, বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, জীবনের লক্ষ্য ও আগ্রহ প্রায় একই স্তরে থাকে। সন্তান নেওয়া, ক্যারিয়ারের পরিবর্তন কিংবা নতুন জীবনচ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করা তাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বেশি থাকে, যা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তবে এর মানে এই নয় যে সমবয়সী সম্পর্কই একমাত্র সঠিক বা সফল পথ।
কিছু ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক দিকও নিয়ে আসতে পারে। বয়সে বড় সঙ্গীর অভিজ্ঞতা আর ছোট সঙ্গীর উদ্যম একত্রে মিললে দায়িত্ব বণ্টনে ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। একজন যদি ক্যারিয়ারে এগিয়ে থাকেন, অন্যজন তখন আবেগগত বা পারিবারিক দায়িত্ব বেশি সামলাতে পারেন। তবে এই ভারসাম্য সব সম্পর্কেই স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে গবেষণার সারকথা হলো, সমবয়সী বা খুব কম বয়সের পার্থক্য থাকা দাম্পত্য সাধারণভাবে স্থায়িত্বের দিক থেকে ভালো করে। বয়সের ব্যবধান যত বাড়ে, বিচ্ছেদের ঝুঁকি তত কিছুটা বাড়তে পারে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের সন্তুষ্টিও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে দাম্পত্যের ভবিষ্যৎ কেবল বয়সের ওপর নির্ভর করে না। পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান, মূল্যবোধের মিল, জীবনলক্ষ্যের সামঞ্জস্য এবং খোলামেলা যোগাযোগই শেষ পর্যন্ত একটি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশেষজ্ঞরা তাই পরামর্শ দেন, বিয়ের আগে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ক্যারিয়ার, সন্তান, পারিবারিক দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত প্রত্যাশা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি। বয়সের পার্থক্য থাকলে একে অপরের মানসিক অবস্থান ও অগ্রাধিকার বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সামাজিক ধ্যানধারণার চেয়ে দুজনের মানসিক মিল, প্রস্তুতি ও দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দেওয়াই একটি স্থায়ী ও সুস্থ দাম্পত্যের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ।


































