এসি চালানোর ট্রেনিং নিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে ৮ কর্মকর্তা
Published : ১২:৪১, ১০ মার্চ ২০২৬
সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং (এসি) সিস্টেম ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের আটজন কর্মকর্তা। তাদের সফরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৫ মার্চ।
একাধিকবার তারিখ পরিবর্তনের পর শেষ পর্যন্ত এই দিনটি চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই সফরে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকও রয়েছেন। আটজন কর্মকর্তার এই সরকারি সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির নাম রাখা হয়েছে ‘হিটিং, ভেন্টিলেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং (এইচভিএসি) সিস্টেম ট্রেনিং’।
তবে যে প্রকল্পের অর্থায়নে এসব কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন, সেই প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ইতোমধ্যে দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা করা হয়েছে।
অন্যদিকে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যে এইচভিএসি সিস্টেমের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে কর্মকর্তারা বিদেশ যাচ্ছেন, সেই কাজের বড় অংশই প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাছাড়া সফরে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশরাফুল হকের চাকরির মেয়াদও কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।
আরও জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন এমন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নন। এমনকি নির্মাণ শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণ কাজেও তাদের সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ নেই। তবু তাদের এই সফরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
নথিপত্র থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডানহাম-বুশ এই আট কর্মকর্তার সফরের যাবতীয় ব্যয় বহন করবে। ডানহাম-বুশ বিশ্বজুড়ে চিলার ও এইচভিএসি সিস্টেম সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় তারা সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম সরবরাহ করেছে। দেশের কয়েকটি বড় শপিংমলেও তাদের সরবরাহ করা এসি সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে।
এদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এই সফর আয়োজনকে ঘিরেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের খরচে সফরে গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ফলে তাদের সরবরাহ করা এইচভিএসি সিস্টেমের মান নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য যেসব কর্মকর্তা অনুমোদন পেয়েছেন তারা হলেন— গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশরাফুল হক, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) কাজী মো. ফিরোজ হোসেন, প্রকল্প পরিচালক ড. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মো. আশরাফুল ইসলাম, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি মো. নাজমুল আলম, নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ, নির্বাহী স্থপতি সিদ্দিকা নাসরিন সুলতানা এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রিসালাত বারি।
২০১৯ সালে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের একটি বড় প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে এক বছর সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়।
পরবর্তীতে আবার প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবে আইএমইডির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমা পার হলেও প্রকল্পের অগ্রগতি এখনও সন্তোষজনক নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটির সব কাজ শেষ হতে সম্ভবত ২০২৮ সালের শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এই প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন হাসপাতালগুলো হলো— ঢাকার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং এটি গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাতজন কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালককে নিয়ে বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওয়ার অনুমতি নিতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়।
সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘সেফটি ফ্যাসিলিটিস, অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট অব এইচভিএসি সিস্টেম’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে তারা যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। প্রাথমিকভাবে সফরের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ দিন। যাওয়া ও ফেরার সময় আলাদাভাবে ধরা হয়েছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তারা সফরে যাননি। পরে আবার নতুন করে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত সফরের অনুমোদন নেওয়া হয়। তাতেও যাতায়াতের সময় আলাদা রাখা হয়েছিল। তবে ওই সময়েও তাদের সফর বাস্তবায়ন হয়নি।
সবশেষে গত ৪ মার্চ মন্ত্রণালয় আবারও এই আট কর্মকর্তার বিদেশ সফরের অনুমোদন দেয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, এসি ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণে অংশ নিতে তারা ১৫ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করবেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করা হবে। কারণ ভবিষ্যতে এইচভিএসি সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের ওপরই থাকবে, তাই প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া প্রকৌশলীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি কেউ অবসরে গেলেও পরবর্তীতে বেসরকারি খাতে কাজ করলে এই প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবেন।
তবে আট কর্মকর্তার এই সফরের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি বলেন, বিষয়টি অবশ্যই খোঁজ নিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।
বিডি/এএন






























