রংপুরে ঘাঁটি রক্ষায় তৎপর জাতীয় পাটি, দুর্গ ভাঙ্গার জন্য মরিয়ে বিএনপি-জামায়াত
Published : ২১:৪৭, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরে ঘাঁটি রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠেছে জাতীয় পাটি। জাপার দুর্গ ভাঙার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি।
আটষট্টি হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, এমন স্লোগান নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় পার্টি।
দীর্ঘ ৯ বছর দেশ শাসনের পর ১৯৯০ সালে ছাত্র জনতার আন্দোলনে পদত্যাগ করেন হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। ক্ষমতা হারানোর পর, জেল থেকে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণ করে বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনের মধ্যে ১৭টি আসনে নির্বাচিত হয়েছিল জাতীয় পার্টি। এ নির্বাচনে জাপা সারা দেশে ৩৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল।
১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনের মধ্যে ১৯টি আসনে নির্বাচিত হয়েছিল জাপা। এ নির্বাচনে জাপা সারা দেশে ৩২টি আসনে জয়লাভ করেছিল। ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনের মধ্যে ১৩টি আসনে নির্বাচিত হয়েছিল জাতীয় পার্টি।
এ নির্বাচনে জাপা সারা দেশে ১৪টি আসনে জয়লাভ করে। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনের মধ্যে ১১টি আসনে নির্বাচিত হয়েছিল জাপা। এ নির্বাচনে জাপা সারা দেশে ২৭টি আসনে জয়লাভ করে। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে বৃহত্তর রংপুরের ২২টি আসনের মধ্যে ৮টি আসনে নির্বাচিত হয়েছিল জাতীয় পার্টি। এ নির্বাচনে জাপা সারা দেশে ৩৪টি আসনে জয়লাভ করেছিল।
জাতীয় পার্টির ঘাঁটি নামে পরিচিত রংপুর এখন ফেটে চৌচির। পতিত আওয়ামী লীগের ফাঁদে পড়ে জাপা ঘাঁটি খ্যাত রংপুর অঞ্চলের সংসদীয় আসনগুলো জাতীয় পাটির হাত ছাড়া হতে শুরু করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা তাদের ঘাঁটি উদ্ধারের তৎপর হয়ে উঠেছে। শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা।
তিস্তাপারের ভাওয়াইয়া-কারুপণ্য-হাঁড়িভাঙা আম খ্যাত রংপুরে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামি, এনসিপি, ইসলামি আন্দোলনসহ ১৪টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ৭ স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ রংপুর জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে এবার মোট প্রার্থী ৪৪ জন।
রংপুর জেলার ৬টি আসনে দলীয় প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক বক্তব্যে ভোটের মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ব্যক্তি জনপ্রিয়তা, দলীয় প্রভাব ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের উপস্থিতিতে এসব আসনে তৈরি হয়েছে বহুমাত্রিক ও আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এমন পরিস্থিতিতে ভোটযুদ্ধে কোথাও এগিয়ে বিএনপি, কোথাও জাতীয় পার্টি আবার কোথাও জামায়াত। তবে জেলার তিনটি আসনে ত্রি-মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে, এমনটাই মনে করছেন ভোটাররা। দিন-রাত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুঁরি নিয়ে প্রার্থীরা ছুটছেন শহরে-বন্দরে, গ্রামেগঞ্জে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে সভা, সেমিনার, উঠান বৈঠক, জনসভায় নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তারা।
কেউ কেউ শোনাচ্ছেন ন্যায্যতা, অধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ দুর্নীতিমুক্ত কাঙ্খিত সংস্কারের কথা। অন্যদিকে, ভোটারদের দাবি অবহেলিত রংপুরের কাঙ্খিত উন্নয়নসহ মৌলিক অধিকার পূরণ যেন হয়।
রংপুর-১ আসন
তিস্তা নদী বেষ্টিত রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া-সিটি কর্পোরেশনের ১-৯ ওয়ার্ড) আসনে নির্বাচনী মাঠে এখন আলোচনা বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীকে কেন্দ্র করে। প্রতীক বরাদ্দের পর এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু বিএনপি প্রার্থীর করা রিটে মনোনয়নপত্র বাতিল হয় জাতীয় পার্টির প্রার্থীর। এতে জামায়াতের ভোট ব্যাংকে কিছুটা সুবিধা এনে দিয়েছে। গঙ্গাচড়া উপজেলা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত রংপুর-১ আসন। বর্তমানে এ আসনে ৫ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী করছেন।
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় ভোটের মাঠে সরব প্রচারণায় থেকেও ছিটকে পড়েছে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলী। দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির দখলে থাকা আসনটি নির্বাচনের আগে হাত ছাড়া হয়ে যায়। এতে করে রংপুর-১ আসনে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বী হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটারা।
নির্বাচনী মাঠে লড়ছেন শক্তিশালী প্রার্থী জেলা বিএনপির সদস্য মোকাররম হোসেন সুজন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী মশিউর রহমান যাদু এ আসনে জয়লাভ করেন। পরে তার মৃত্যুতে ছেলে শফিকুল গনি স্বপন উপনির্বাচনে ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসটিতে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রায়হান সিরাজী।
ভোটাররা বলেন, বিএনপির মোকাররম হোসেন সুজন জনপ্রিয় মানুষ। জামায়াতে ইসলামীর রায়হান সিরাজী মহানগরের সেক্রেটারি হওয়ায় তারও রয়েছে সুপরিচিতি। তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নসহ স্থানীয় উন্নয়ন এবং অনিয়ম, দুর্নীতি রুখে ঐক্যের রাজনীতির মধ্য দিয়ে তৃণমূলে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরবে এমনটাই চাইছেন ভোটাররা।
রংপুর-১ আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা, কাঁচি প্রতীকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের আহসানুল আরেফিন ও চেয়ার প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মো. আনাম।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার ২২৭ জন। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৫৭ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। এখানে ভোট গ্রহণে ১৩৯টি কেন্দ্রে ৭১৩টি বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে।
রংপুর-২ আসন
বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর-২ আসনে মোট ভোটার ৩ লক্ষ ৮০ হাজার ৯২১ জন। এর মধ্যে ৩ হাজার ১১৬ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। ১৩৭টি কেন্দ্রের ৮০১টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হবে।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বি ৫ প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর এটিএম আজহারুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির আনিছুল ইসলাম মন্ডল (লাঙ্গল), বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলনের আশরাফ আলী (হাতপাখা) ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির আজিজুর রহমান (তারা)। এ আসনে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে হেভিওয়েট হিসাবে দেখছেন ভোটাররা।
কারণ এই তিনজনের দু’জনই সাবেক সংসদ সদস্য এবং অন্যজন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা। স্বাধীনতার পর রংপুর-২ আসনে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭বার, জাতীয় পার্টি ৫ বার এবং বিএনপি একবার বিজয়ী হয়েছিল।
১৯৭৯ সালে এ আসনে বিএনপি প্রার্থী মোহম্মদ ইলিয়াছ বিজয়ী হন। এবার এ আসনে আশার আলো দেখছে বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর অবস্থান কিছুটা শক্ত।
রংপুর-২ আসন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির উর্বর ভ‚মি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই। ফলে ভোটের হিসেব-নিকেশে জাতীয় পার্টির আনিছুল ইসলাম মন্ডল এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করেন অনেকেই। অন্যদিকে জেলা বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মাদ আলী সরকারও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সেই সঙ্গে সংসদীয় এলাকার উন্নয়নে অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কথা বলছেন তিনি। অন্যদিকে এ আসন থেকে ১১ দলীয় জোটের সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম লড়ছেন। আসনটি জামায়াতের জন্য মর্যাদার।
আগের চেয়ে এখানে জামায়াতে অবস্থান শক্তিশালী বলে মনে করছেন দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। এ কারণে ত্রি-মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস ভোটারদের কণ্ঠে। প্রচার-প্রচারণায় শ্যামপুর চিনিকল চালু করাসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মৌলিক চাহিদা পূরণ ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
রংপুর-৩ আসন
জাতীয় পার্টির দুর্গ বলা হয় সদর উপজেলা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের ১০ থেকে ৩৩টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ণ এই আসনকে। দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে এ আসনে আধিপত্য ধরে রেখে লাঙ্গলের প্রতিনিধিরা।
রংপুর-৩ আসনে প্রতিনিধিত্ব করেছেন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মাদ এরশাদ, তার স্ত্রী রওশন এরশাদ, ছেলে সাদ এরশাদ ও সর্বশেষ তার ছোট ভাই বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের। যদিও সবশেষ বির্তকিত তিনটি সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতায় জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগের ছায়া হয়ে থাকা জাতীয় পার্টিকে নিয়ে রয়েছে অনেক বির্তক। তবে এবার এ আসনে জাতীয় পার্টি অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
জয়ের পরিকল্পনা নিয়ে সরব প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জিএম কাদেরসহ দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই আসনে বিএনপি শুধু একবার জয় পেয়েছে। তাও আবার ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে। এখানে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট রেজাউল হক সরকার রানা। এবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন দলটির রংপুর মহানগরের আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু।
নির্বাচনে জিতলে এ এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর মাহাবুবুর রহমান বেলাল আর ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা হাতে আমিরুজ্জামান পিয়ালও জানান দিচ্ছেন শক্ত প্রতিদ্ব›িদ্বতা গড়ার।
অন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রার্থীরা হলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের আব্দুল কুদ্দুস (মই), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মাকর্সবাদীর আনোয়ার হোসেন বাবলু (কাঁচি), সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী রিটা রহমান (সূর্যমুখী) ও আনোয়ারা ইসলাম রানী (হরিণ)।তৃতীয় লিঙ্গের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী। এবারের সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের স্বতন্ত্র প্রার্থী লড়ছেন রংপুর-৩ আসনে। এখানে ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ভোটারদের নজর কাড়ছে তিনি।
চলাফেরা করেন ৩৮ লক্ষ টাকার গাড়িতে। পোশাকে, কথাবার্তায় স্মার্ট এই প্রার্থীর নাম আনোয়ারা ইসলাম রানী। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার জন্য ভোটের লড়াইয়ের দাবি রানীর। আর জেন্ডার বিষেশজ্ঞরা মনে করেন রানীর এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু আক্ষরিক নয়, চ্যালেঞ্জ ও সাহসের।
গত সংসদ নির্বাচনে ঈগল প্রতীকে জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে চমক সৃষ্টি করেছিলেন রানী। বিভাগীয় নগরী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রংপুর-৩ আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লক্ষ ৮ হাজার ২২৪ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ২৩০ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। এ আসনে ১৬৯টি ভোট কেন্দ্রে ৯৮৩টি বুথ থাকবে।
রংপুর-৪ আসন
শিল্পপতির আসন খ্যাত রংপুর-৪ আসন। প্রায় ৩০ বছর ধরে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শিল্পপতিরা। সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ধানের শীষের বিএনপির প্রার্থী শিল্পপতি এমদাদুল হক ভরসা। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের দখলে থাকা এ আসনটি উদ্ধারে এবার মরিয়া দলটির নেতাকর্মীরা।
অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির প্রার্থী আখতার হোসেন শাপলা কপি প্রতীকে ১১ দলীয় জোট থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিস্তা নদী বেষ্টিত পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত শিল্পপতিরা নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।
এর মধ্যে ভরসা পরিবার থেকে বিএনপির হয়ে রহিম উদ্দিন ভরসা ও জাতীয় পার্টি থেকে করিম উদ্দিন ভরসা নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে রংপুর-৪ আসনে শিল্পপতি আওয়ামী লীগের টিপু মুনশি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
এর মধ্যে ২০১৮ সালের বিতর্কিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বিএনপির এমদাদুল হক ভরসা। রাতের ভোটখ্যাত সেই নির্বাচনে টিপু মুনশির কাছে পরাজিত হলেও তিনি পেয়েছিলেন লক্ষাধিকের বেশি ভোট। এবার জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত‚ সাড়ায় বাবার আসন পুনরুদ্ধারের সঙ্গে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত বলে মনে করছেন এমদাদুল হক ভরসা।
আসনটি পুনরুদ্ধারে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন লাঙ্গল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু নাসের শাহ মাহবুবার রহমান।
এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অন্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলনের জাহিদ হোসেন (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আবু সাহমা (রিকশা), বাংলাদেশ কংগ্রেসের উজ্জ্বল চন্দ্র রায় (ডাব), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মাকর্সবাদীর প্রগতি বর্মণ তমা (কাঁচি) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম বাসার (হরিণ)।
পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে আওয়ামী লীগ ৬ বার, জাতীয় পার্টি ৪ বার এবং বিএনপি ১ বার জয় পেয়েছিল। এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার ৫ লক্ষ ৯ হাজার ৯০৬ জন। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৪৩ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। দুই উপজেলার ১৬৩টি ভোট কেন্দ্রের ৯৪৪টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হবে।
রংপুর-৫ আসন
জামায়াত অধ্যুষিত উপজেলা হিসেবে পরিচিত মিঠাপুকুর। রংপুর-৫ আসনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটাররা বলছেন, ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথা। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তিন প্রার্থীই জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক গোলাম রব্বানী (দাঁড়িপাল্লা) ও বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক গোলাম রব্বানী (ধানের শীষ)। দুই দলের প্রার্থীর নাম একই হওয়ায় ভোটারদের মধ্যে এ নিয়ে রয়েছে আলোচনা।
আওয়ামী শাসনামলে কোনঠাসা হয়ে থাকা বিএনপি এখন সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় এ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার আভাস মিলেছে তাদের নেতাকর্মীর কাছ থেকে। বিএনপি থেকে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। এবার সেই হারানো আসন পুনরুদ্ধারে চমক দেখাতে চান অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।
অন্যদিকে রাজনীতি থেকে সাময়িক নীরবতা কাটিয়ে ভোটের মাঠে সক্রিয় হওয়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী শিল্পপতি এসএম ফখর উজ জামান জাহাঙ্গীর মুখিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকের দিকে। এতে করে বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ে গড়াতে পারে ব্যালটযুদ্ধ।
এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন ইসলামী আন্দোলনের গোলজার হোসেন (হাতপাখা), নাগরিক ঐক্যের মোফাখখারুল ইসলাম নবাব (কেটলি), বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি-সিপিবির আবু হেলাল (কান্তে), আমার বাংলাদেশ পার্টির আব্দুল বাছেত (ঈগল), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মাকর্সবাদীর বাবুল আক্তার (কাঁচি) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের মাহবুবুর রহমান (ডাব)।
মিঠাপুকুর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত রংপুর-৫ আসনে ৪ হাজার ৪৪৫ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধিত তালিকায় রয়েছেন। এখানে মোট ভোটার ৪ লক্ষ ৬৯ হাজার ১৮৯ জন। ১৫২টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে ৯১৪টি বুথে।
রংপুর-৬ আসন
ভিআইপি আসন হিসেবে খ্যাত রংপুর-৬ পীরগঞ্জ আসন। এ আসন থেকে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জাতীয় সংসদেও সাবেক স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে এবার নির্বাচনের সমীকরণ ভিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের অধিপত্য চলেছে সমানতালে।
বিএনপি শুধু একবারই বিজয়ী হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের নির্বাচানে এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মতিয়ার রহমান চৌধুরী। এবার আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়ই হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। পীরগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়নবাসীর কাছে পরিচিত মুখ বিএনপির সাইফুল ইসলাম।
এছাড়াও তাকে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মাদ মন্ডল সমর্থন দিয়েছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তবে এই গুঞ্জন সত্যি হলে ভোটের দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন সাইফুল ইসলাম। অন্যদিকে জামায়াতের রাজনীতিও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
একাধিকবার দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের আগমন ঘিরে অনেকটাই সাংগঠনিকভাবে নিজেদের শক্তিশালী ভাবছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা।
এ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা ইসলামী আলোচক ও সুবক্তা হিসেবে পরিচিত মাওলানা নুরুল আমিন বেশ জনপ্রিয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। সাইফুল ইসলাম ও নুরুল আমিনসহ ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এর মধ্যে রয়েছেন জাতীয় পার্টির নুর আলম মিয়া (লাঙ্গল), আমার বাংলাদেশ-এবি পার্টির ছাদেকুল ইসলাম (ঈগল), ইসলামী আন্দোলনের সুলতান মাহমুদ (হাতপাখা), স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু জাফর মো. জাহিদ (ঘোড়া), স্বতন্ত্র প্রার্থী খন্দকার শাহিদুল ইসলাম (ফুটবল) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী (সূর্যমুখী)। এ আসনে ২ হাজার ৮৭৬ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। এখানে মোট ভোটার ৩ লক্ষ ৫৫ হাজার ৭৩৫ জন। ১১৩টি কেন্দ্রে ৬৬৩টি বুথে ভোট গ্রহণ করা হবে।
বিডি/এএন




























