অপমানের বদলা নিতেই পাবনায় দাদি ও নাতনিকে খুন-ধর্ষণ!
Published : ১৭:৫০, ১ মার্চ ২০২৬
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় দাদি ও নাতনিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পাবনা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামের রাব্বি মন্ডল ও শরিফুল ইসলাম নামে দুই যুবককে আটক করা হয়। থানায় হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শরিফুল ইসলাম শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এবং ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়।
নিহত কিশোরীর চাচাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের একটি অপমানের প্রতিশোধ নিতেই প্রথমে দাদিকে এবং পরে নাতনিকে হত্যা করে শরীফ।
পাবনা জেলা ডিবির ওসি রাশিদুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়। স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ভিত্তিতে শনিবার রাত ১০টার দিকে সন্দেহভাজন হিসেবে শরীফুল ইসলামকে আটক করা হয়। ডিবি কার্যালয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সে নিজের অপরাধ স্বীকার করে এবং হত্যার লোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরে।
পুলিশের কাছে শরীফ স্বীকার করেছে, যৌন হয়রানির চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া এবং তাতে কিশোরীর বাধা দেওয়ায় সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই সে জয়নাল খাঁর মা সুফিয়া খাতুন (৬৫) ও তার নাতনি জামিলা আক্তারকে (১৫) হত্যা করে। গ্রেফতার শরীফ ও নিহতরা সবাই ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
জামিলা স্থানীয় একটি মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। এ ঘটনায় জামিলার বোন বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জামিলার বাবা জয়নাল খাঁ জীবিকার প্রয়োজনে প্রায়ই ঢাকার সাভারে বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করতেন। জামিলা গ্রামের বাড়িতে তার দাদি সুফিয়া খাতুনের সঙ্গেই থাকত। ঘটনার সময়ও বাড়িতে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
ডিবি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ট্রাকচালক শরীফুল ইসলাম শরীফ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়। সে ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে বাজার পৌঁছে দেওয়ার অজুহাতে সে জামিলাদের বাড়িতে যায়। তখন সুফিয়া খাতুন বাড়িতে না থাকায় সুযোগ বুঝে জামিলার প্রতি যৌন হয়রানির চেষ্টা করে।
এতে কিশোরী প্রতিবাদ করে তাকে চড় মারে। অপমানিত হয়ে শরীফ সেখান থেকে চলে আসে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা পোষণ করতে থাকে।
এর কয়েকদিন পর, শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে শরীফ আবারও ওই বাড়িতে যায়। সে সময় সে আগের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে আসে বলে জানায়।
কিন্তু সুফিয়া খাতুন তাকে ক্ষমা না করে চিৎকার শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষিপ্ত শরীফ পাশে থাকা একটি কাঠের বাটাম (কুন্নিসহ) দিয়ে সুফিয়া খাতুনের মাথায় একের পর এক আঘাত করে।
বৃদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে জামিলা চিৎকার করে ওঠে। তখন শরীফ একই কুন্নি দিয়ে তার মাথা ও কপালে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় জামিলা মাটিতে পড়ে গেলে শরীফ তাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির পাশের একটি খোলা সরিষাক্ষেতের দিকে নিয়ে যায়।
পথিমধ্যে পুকুরপাড়ে নিয়ে কিশোরীকে ধর্ষণ করে বলে সে স্বীকার করেছে। এরপর গলা টিপে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ সরিষাক্ষেতে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পরপরই ঈশ্বরদী থানার ওসি মমিনুজ্জামান ও ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার আগের রাত, শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতের পর ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রামে কান্নার শব্দ শুনে স্থানীয়রা বের হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ভেবে নিজ নিজ ঘরে ফিরে যান।
শনিবার সকালে বাড়ির উঠানে সুফিয়া বেগমের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্বজনরা। এ সময় নাতনি জামিলা নিখোঁজ থাকায় তাকে খুঁজতে শুরু করা হয়। পরে বাড়ি থেকে কিছু দূরের একটি সরিষাক্ষেত থেকে তার বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত সুফিয়া বেগম ছিলেন ওই গ্রামের মৃত নাজিম উদ্দিন খাঁর স্ত্রী। জামিলা আক্তার কালিকাপুর দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী ও একজন হাফেজা ছিল। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় দাদি-নাতনি একসঙ্গেই বসবাস করতেন।
ঘটনার খবর পেয়ে রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার মো. শামীম হোসেন এবং পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের আশ্বাস দেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ মোটিভ বা কারণ সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি। নিহত দুজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
বিডি/এএন


































