ইউক্রেনে সহায়তা কেন্দ্রে রুশ হামলা, নিহত ২৬

ইউক্রেনে সহায়তা কেন্দ্রে রুশ হামলা, নিহত ২৬ ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Published : ১০:৩৪, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়ায় মানবিক সহায়তা বিতরণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্কুলে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন উদ্ধারকর্মী ও চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। স্থানীয় সময় সোমবার (২ নভেম্বর) এই হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

ইউক্রেনের ভাষ্য অনুযায়ী, খেরসন অঞ্চলে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাপোরিঝঝিয়ায় হামলা চালানো হয়। গত মঙ্গলবার শুরু হওয়া ওই যুদ্ধবিরতি রোববার শেষ হয়। বিরতি চলাকালে রাশিয়া কিংবা ইউক্রেন—কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেনি।

প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, জাপোরিঝঝিয়ার একটি গ্রামের স্কুলে প্রতি সোমবার স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হতো। ঘটনার দিনও প্রয়োজনীয় সহায়তা সংগ্রহ করতে সেখানে অনেক মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। তার দাবি, লোকজন জড়ো হওয়ার পরপরই রাশিয়া কয়েকটি বিমানবোমা নিক্ষেপ করে। এরপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

আঞ্চলিক ভারপ্রাপ্ত গভর্নর মিখাইলো সেমিকিন টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় জানান, নিহতদের মধ্যে দুজন উদ্ধারকর্মী এবং চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ নিহত উদ্ধারকর্মীদের ডেনিস কোনোভালেঙ্কো ও ওলেক্সি সুশচেভস্কি হিসেবে শনাক্ত করেছে। দুজনেরই বয়স ছিল ৪৪ বছর।

জরুরি সেবা বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সত্ত্বেও উদ্ধারকর্মীরা প্রতিদিন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা করতেন। হামলার পর প্রকাশিত ভিডিওতে স্কুল ভবনটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। উদ্ধারকর্মীদের সেখানে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে তল্লাশি চালাতেও দেখা গেছে।

জেলেনস্কি বলেন, ওলেশকিতে মানবিক উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জাপোরিঝঝিয়ায় এই প্রাণহানির ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

যুদ্ধবিরতি ও ওলেশকি থেকে উদ্ধার অভিযান

রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহর থেকে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় স্থানীয় পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। মঙ্গলবার শুরু হয়ে রোববার শেষ হওয়া এই বিরতিকে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই উদ্যোগের আওতায় ওলেশকি থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের একাংশ ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় এবং অন্যরা রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত ক্রিমিয়ায় আশ্রয় নেন।

ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোববার এএফপিকে জানান, যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল কিয়েভ। তবে মস্কো সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। অন্যদিকে, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া নিজেদের সামরিক অবস্থান আরও সুসংহত করেছে।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এ অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেননি। সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করা স্বাভাবিক বিষয়। তার দাবি, অতীতেও ইউক্রেনীয় বাহিনী যুদ্ধবিরতির সময় নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ নিয়েছে।

ওলেশকির উদ্ধার কার্যক্রমকে সফল হিসেবে বর্ণনা করেন পেসকভ। তার মতে, অভিযানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ছিল। এতে রাশিয়ার মানবাধিকার কমিশনার ইয়ানা লান্ত্রাতোভা এবং ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে আপাতত এ ধরনের নতুন কোনো মানবিক অভিযান আয়োজনের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।

আবুধাবিতে ফের আলোচনায় বসছে রাশিয়া-ইউক্রেন

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরবর্তী শান্তি আলোচনা আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের অবসানে সমঝোতায় পৌঁছাতে চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এখন পর্যন্ত আলোচনায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি আসেনি। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ক্রমশ মস্কোর অবস্থানের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠছেন কি না, তা নিয়ে কিয়েভ ও ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

দুই দেশের জরুরি সতর্কতা অ্যাপে সাইবার হামলা

যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশ তাদের জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মোবাইল অ্যাপে সাইবার হামলার খবর জানিয়েছে।

ইউক্রেনের অভিযোগ, তাদের বিমান হামলার সতর্কতা ব্যবস্থা হ্যাক হয়ে থাকতে পারে। এর ফলে লাখ লাখ মানুষের মোবাইল ফোনে তেজস্ক্রিয়তা-সংক্রান্ত হামলার বিষয়ে ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে আগাম সতর্ক করতে ইউক্রেনের এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ের একটি অ্যাপেও সাইবার হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে মস্কো। তবে রাশিয়ায় এই অ্যাপের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সীমিত। দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার সতর্কতা সাধারণত মোবাইল ফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রাণঘাতী হামলা ও সাইবার আক্রমণের ঘটনা দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement