অপ্রতিম হত্যা: তিন কিশোরের জবানবন্দিতে পরিকল্পনা ও হামলার বর্ণনায় মিল
Published : ১১:৫০, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কুমিল্লার ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিন কিশোরের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া এবং হামলার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। তবে পাহাড়ে যাওয়ার পথ, ঘটনাস্থল ত্যাগ এবং হত্যার পরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল। ঘটনার দিন ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে চারজন একই জায়গা থেকে পাহাড়ে যাননি। প্রত্যেকের বক্তব্যে যাত্রাপথ ও সাক্ষাতের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি তাকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ায়, অর্থাৎ তাঁর চাচা শাহ আলমের পাহাড়ে নিয়ে যান।
অন্যদিকে, অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোর জানিয়েছে, দুপুর ২টার পর কোটবাড়ি বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগে সে আরেক কিশোর বন্ধুকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।
তৃতীয় কিশোরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে তার সঙ্গে দেখা হলে তাকেও হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। বিকেল ৪টার পর তারা পাহাড়ে গিয়ে তুহিন ও অপ্রতিমকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে। সেখানে পৌঁছে তারা কিছু সময় গল্প ও আড্ডা দেয়।
তিন আসামির জবানবন্দিতে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগে অপ্রতিমের মোবাইল ফোনটি তার কাছ থেকে নেওয়া হয়।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের ভাষ্যমতে, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম তা দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর ফোনটি তুহিনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তুহিনের জবানবন্দিতেও ফোন নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অপ্রতিম ফোনটি ফেরত চাইলে তুহিনের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে অপ্রতিমকে থাপ্পড় দেন এবং পরে পাশে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন।
তিনটি জবানবন্দিতেই তুহিনের প্রথম আঘাতের কথা উঠে এসেছে। তুহিনের ভাষ্য অনুযায়ী, আঘাত করার পর তিনি অন্য দুজনকে অপ্রতিমকে মারতে বলেন।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে কে কীভাবে চলে যায়, সে বিষয়ে আসামিদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
তুহিনের ভাষ্যমতে, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায় এবং তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।
অপ্রতিমের দোকানের কর্মী কিশোরের জবানবন্দি অনুযায়ী, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর সে ও তার কিশোর বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে চলে আসে। সে সময় তুহিন সেখানে ছিলেন।
অন্যদিকে, তৃতীয় কিশোর জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায় এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান।
হত্যাকাণ্ডের পরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। তুহিন জানান, পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা ফোন করে খোঁজ নেওয়ার পর তিনি এক বন্ধুকে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।
অপ্রতিমের দোকানের কর্মরত কিশোরের ভাষ্য, সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সন্ধ্যায় ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।
তুহিনের জবানবন্দিতে তার এক বন্ধুর বিষয়ে নতুন তথ্য এসেছে। তুহিন জানান, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি ওই বন্ধুকে ডেকে পুরো ঘটনা জানান। তাঁর দাবি, ওই বন্ধু হত্যার পরিকল্পনার বিষয়টিও আগে থেকে জানত।
তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে ওই বন্ধুর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ নেই। সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ না নিলেও তথ্য গোপনের অভিযোগে পুলিশ ওই বন্ধুকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রথমে তুহিনকে শনাক্ত করে পুলিশ। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।
তিন আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, ফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে মিল থাকলেও হত্যার পর কে কোথায় গেছে, তুহিনের বন্ধুর সম্পৃক্ততা কতটা এবং এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তসাপেক্ষ।
পুলিশ জানিয়েছে, জবানবন্দির তথ্য অন্যান্য সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও উদ্ধার হওয়া আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র নিশ্চিত করা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।





























