ইতিহাস বলছে ৮০ বছর টেকে না ইহুদি রাষ্ট্র

ইতিহাস বলছে ৮০ বছর টেকে না ইহুদি রাষ্ট্র ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৫:০০, ৯ মার্চ ২০২৬

ইহুদি রাষ্ট্র সাধারণত ৮০ বছরের বেশি টিকে থাকে না—এমন একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। সে হিসেবে ইসরাইল রাষ্ট্রের আয়ু নাকি আর মাত্র দুই বছর—এমনই এক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন দেশটির সাবেক জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।

২০২২ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। হিব্রু ভাষার সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথকে তিনি বলেছিলেন, ‘ইতিহাসজুড়ে ইহুদিরা ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ধ্বংসের প্রক্রিয়া সাধারণত ৮০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায়।’ বিষয়টি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জেরুজালেম পোস্ট।

ঐতিহাসিক সেই ‘অষ্টম দশক’ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে বর্তমানে ইসরাইলও সেই সময়সীমার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্রটির বয়স এখন প্রায় ৭৮ বছর।

প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার দাপটে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে ইসরাইল। তবে এই দৃশ্যমান সাফল্যের আড়ালেই অনেকের মনে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সেই পুরোনো আশঙ্কা—‘অভিশপ্ত ৮০’। ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থ তালমুদে বলা হয়েছে, কোনো ইহুদি রাষ্ট্রই নাকি ৮০ বছরের বেশি স্থায়ী হয় না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে কিছু উদাহরণও পাওয়া যায়, যেখানে বাহ্যিক আক্রমণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজনই রাষ্ট্রগুলোর পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণেই ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ।

এপি জানায়, ইতিহাস বলছে গত প্রায় দুই হাজার বছরে ইহুদিরা যে কয়েকটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়েছিল, যেমন কিং ডেভিডের রাজ্য কিংবা হাসমোনিয়ান রাজ্য—তার একটিও ৮০ বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি।

প্রথম ইহুদি রাজ্য হিসেবে পরিচিত কিং ডেভিডের রাজ্য প্রায় ৮০ বছর টিকে ছিল। কিন্তু ৮১তম বছরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সেই রাজ্য ভেঙে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়—যিহুদা ও ইসরাইল নামে দুটি আলাদা অংশে। এতে লাখো মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় ইহুদি রাষ্ট্র ছিল হাসমোনিয়ান রাজ্য, যা প্রায় ৭৭ বছর স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থায় টিকে ছিল। কিন্তু অষ্টম দশকে প্রবেশ করার পর অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সেটিও ভেঙে পড়ে এবং পরে রোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই এই রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব শেষ করে দেয়।

ইসরাইলি লেখক মেনাচেম রাহাত মনে করেন, বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্রও একই ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তার মতে, দেশকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও ঘৃণা।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বাইরের হুমকি—যেমন সন্ত্রাসী হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ—মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও ভেতরের বিভাজন এবং পারস্পরিক ঘৃণা একটি রাষ্ট্রকে ভেঙে দিতে পারে। বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। অর্থাৎ ২০২৮ সালে এই রাষ্ট্রটির বয়স পূর্ণ হবে ৮০ বছর।

তালমুদের সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হলে কয়েক বছরের মধ্যেই রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়েই আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ইসরাইলি সমাজ ও রাজনীতিতে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ইতিহাস কি আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে?

এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই আলোচনা করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক। ইয়েদিয়োত আহরোনোত পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইসরাইলি সমাজে বিভাজন উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে।

ধর্মনিরপেক্ষ, কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী, আরব নাগরিক এবং জায়োনিস্ট মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা দেশের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ এই পরিস্থিতি অনেক ইসরাইলির মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে—তাদের মনে প্রশ্ন জাগছে, ইতিহাসের সেই চক্র কি আবারও ফিরে আসছে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ মূলত একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা হলেও এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যেতে পারে। অতীতে ইহুদি রাষ্ট্রগুলো যেমন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভাজনের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, তেমনি বর্তমান ইসরাইলও নানা ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত।

ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্মীয় মৌলবাদ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং জাতিগত উত্তেজনা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে দেশটির ভেতরে বিরোধ বাড়ছে। তাই অনেক বিশ্লেষক এই ধারণাকে নিছক কুসংস্কার হিসেবে নয়, বরং একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেই দেখছেন। শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হয়তো বিষয়টি এত আলোচিত হতো না।

কিন্তু বাস্তবে এই ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ কথাটি এমন অনেক নেতার মুখ থেকেও শোনা গেছে, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব দেশজুড়ে ব্যাপক। এজন্যই বিষয়টি এখন ইসরাইলের রাজনীতি ও সমাজে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement