বড় হামলায়ও ইরানে সরকার পতন সম্ভব নয়: মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট

বড় হামলায়ও ইরানে সরকার পতন সম্ভব নয়: মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৭:৩৪, ৮ মার্চ ২০২৬

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। টানা আট দিন পার হয়ে গেলেও যুদ্ধ থামার কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না; বরং উভয় পক্ষই হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।

ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে দেশটিতে নিজের পছন্দমতো সরকার গঠনের ইচ্ছার কথা জানানোর পর তেহরানের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এই ঘটনার পর তিনি আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। এমনকি ইরানের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সম্ভাব্য নেতৃত্বদের হত্যার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, বড় পরিসরে সামরিক হামলা চালানো হলেও ইরানে সরকারের পূর্ণ পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরুর আগেই এই মূল্যায়নমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (এনআইসি)।

এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—ইরানে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হলেও কেবল সেই আঘাতের মাধ্যমে দেশটির বিদ্যমান ধর্মতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হবে না।

ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য, বিশ্লেষণ ও ভিন্ন ভিন্ন মতামতের ভিত্তিতে মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। এটি তুলসী গ্যাবার্ডের অধীন ‘অফিস অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’-এর একটি অংশ হিসেবে কাজ করে। কাউন্সিলের কিছু প্রতিবেদন বিভিন্ন সংস্থার যৌথ অংশগ্রহণে তৈরি হলেও অনেক সময় তুলনামূলক কম সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বাধীনভাবেও কিছু মূল্যায়ন প্রস্তুত করা হয়।

গত মাসের শেষ দিকে প্রস্তুত করা এনআইসির এই খসড়া নথিটি মূলত সিআইএর একটি বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। ওই বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে যদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহতও হন, তবুও সেখানে সরকারের সম্পূর্ণ পতন বা কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি পরিষদের নিজস্ব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি একটি স্বাধীন নথি।

এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে যে, ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দেশটির রাষ্ট্র কাঠামোর গভীরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত।

গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের অনেকেই সন্দিহান যে, কোনো গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)কে ক্ষমতা থেকে সরানো আদৌ সম্ভব হবে কি না। কারণ এই সংস্থাটি শুধু নিরাপত্তা কাঠামোর বড় অংশই নয়, ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ওপরও প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

এনআইসির এই প্রতিবেদনটি এর আগেও মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত হয়েছিল।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রথম দফার আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয় বলে দাবি করা হয়। একইসঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কমান্ডারও ওই হামলায় নিহত হন।

এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও পাল্টা হামলা শুরু করে। ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে থাকে তারা। টানা নয় দিন ধরে চলা এই হামলা-পাল্টা হামলার ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এখন এক ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের ওপর আরও কঠোর ও ব্যাপক হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নতুন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে ইরান।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিস্তার ঘটানো এবং তাদের সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছে।

এ কারণে ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চল, সামরিক বাহিনী এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অবস্থান নতুন করে পর্যালোচনা করছে। যেসব স্থাপনা এখনো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর লক্ষ্য তালিকায় নেই, সেগুলোও তালিকাভুক্ত করে ভবিষ্যতে হামলা চালানো হতে পারে।

এরই মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরান। সর্বশেষ দফায় এসে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে দেশটি, যা সংঘাতকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement