‘ইফতারের সময় আকুতি-মিনতি করেছি, একটু পানিও দেয়নি পুলিশ’

‘ইফতারের সময় আকুতি-মিনতি করেছি, একটু পানিও দেয়নি পুলিশ’ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৬:৩১, ৮ মার্চ ২০২৬

কক্সবাজারের পেকুয়া থানার ভেতরে পুলিশের মারধরের শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলা রেহেনা মোস্তফা (৪২) ও তাঁর মেয়ে জুবাইদা বেগমকে (২১) ভ্রাম্যমাণ আদালত এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিল।

তবে পরে সেই সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলমের আদালত। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টার দিকে আপিল শুনানি শেষে আদালত ভ্রাম্যমাণ আদালতের দেওয়া সাজা বাতিলের আদেশ দেন।

সাজা বাতিল হওয়ার পর শনিবার সন্ধ্যায় রেহেনা মোস্তফা ও তাঁর মেয়ে জুবাইদা কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তারা চিকিৎসার জন্য চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।

এর আগে গত বুধবার বিকেলে পেকুয়া থানায় ডেকে নিয়ে এই মা-মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে সেদিনই থানার ভেতরে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম দুজনকে এক মাস করে কারাদণ্ড দেন। ওইদিন সন্ধ্যায় তাদের কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা মোস্তফা ও তাঁর স্বামীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। ২০১৩ সালের ২৩ মে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হলে সম্পত্তির অংশ পাওয়ার দাবিতে চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন জুবাইদা। কিন্তু তাঁরা জুবাইদাকে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা করা হয়। আদালত মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে এবং তদন্তভার দেওয়া হয় উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষের কাছে।

স্বজনদের অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য এসআই পল্লব রেহেনা ও জুবাইদার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তাঁকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তবে টাকা নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেন তিনি। এরপর টাকা ফেরত চেয়ে রেহেনা ও তাঁর মেয়ে একাধিকবার এসআই পল্লবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু টাকা ফেরত না পাওয়ায় গত ১৩ জানুয়ারি তারা কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে গতকাল রাত সাড়ে নয়টার দিকে কথা হয় রেহেনা মোস্তফার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে বুধবার আমাদের থানায় ডেকেছিল পুলিশ। আমি আর আমার মেয়ে সেখানে গেলে পুলিশ আমাদের বেধড়ক মারধর করে। এরপর থানায় ইউএনও আসেন। আমরা তাঁকে পুলিশের নির্যাতনের কথা বলি। তখন মনে হয়েছিল তিনি হয়তো আমাদের বাঁচাতে এসেছেন। কিন্তু তিনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেও কিছু না বলে ওপরের কক্ষে চলে যান। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সেখান থেকে নেমে তিনি ও ওসি নিজেদের মতো করে চলে যান। এরপর পুলিশ আমাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়।’

রেহেনা মোস্তফা আরও বলেন, ‘হাসপাতালে নেওয়ার কথা বললেও আমাদের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রামু এলাকায় ইফতারের সময় হলে আমরা অনেক অনুরোধ করেছি, তবুও পুলিশ আমাদের এক ফোঁটা পানিও দেয়নি। অথচ তাদের হাতে ইফতারের জন্য জুস ও অন্যান্য খাবার ছিল। খালি পেটে কাজ আছে বলে আমাদের ইফতার করতেও দেয়নি।’

তিনি আরও দাবি করেন, কারাগারে নেওয়ার পর তাঁদের শরীরের আঘাত দেখে প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রহণ করতে চাননি। রেহেনা মোস্তফা বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে আমাদের নিতে রাজি হননি।

তারা বলেন, কাগজপত্র ঠিকমতো আনতে হবে, কারণ আমাদের শরীরে অনেক আঘাত রয়েছে। রাতে যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তারা কীভাবে জবাব দেবেন। পরে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে ই-মেইলে কিছু কাগজপত্র পাঠানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের গ্রহণ করেন। পরদিন সকালে জানতে পারি, ইউএনও আমাদের এক মাসের সাজা দিয়েছেন।’

এই ঘটনার জন্য ইউএনও, ওসি, এসআই পল্লব কুমার ঘোষ এবং নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তির দাবি জানান রেহেনা মোস্তফা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি পেকুয়ার মেয়ে। আমি নির্যাতনের শিকার। আমি সুষ্ঠু বিচার চাই।’

এ বিষয়ে শুক্রবার ইউএনও মাহবুবুল আলম জানিয়েছিলেন, তাঁর উপস্থিতিতেই থানার ভেতরে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সে কারণেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা-মেয়েকে সাজা দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, সাজার বিষয়টি তাদের সামনে জানানো হয়েছিল।

তবে মুক্তি পাওয়ার পর রেহেনা মোস্তফা বলেন, থানায় অবস্থান করার সময় তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কোনো কার্যক্রম সম্পর্কে জানতেন না। তাদের সামনে কোনো বিচার হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, কক্সবাজারে কারাগারে নেওয়ার পরদিন সকালে তারা জানতে পারেন যে তাদের এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রেহেনা মোস্তফার অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইউএনও মাহবুবুল আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। একইভাবে থানায় নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে জানতে পেকুয়া থানার ওসিকেও বারবার ফোন করা হয়, কিন্তু তিনিও ফোন ধরেননি।

তবে শুক্রবার সাংবাদিকদের ডেকে তিনি বলেছিলেন, ‘ওই দুই নারী খুবই উচ্ছৃঙ্খল। তারা বিভিন্ন সময় থানায় এসে ধর্ষণ মামলার হুমকি দিতেন। এমনকি বিষের বোতল নিয়ে এসে বিষপানের ভয়ও দেখাতেন।

তাদের বিরুদ্ধে থানায় পাঁচটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। গত বুধবার তারা থানার ভেতরেই পুলিশের ওপর হামলা চালান এবং অন্তত পাঁচজন পুলিশের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। এতে তিনজন নারী কনস্টেবল আহত হন এবং চিকিৎসা নেন।’

অন্যদিকে এসআই পল্লব কুমার ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মারধর ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।’

রেহেনা মোস্তফা ও তাঁর মেয়ের আইনজীবী মিজবাহ উদ্দিন জানান, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আপিলের শুনানি শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দেওয়া সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে খালাস দিয়েছেন। পরে শনিবার সন্ধ্যায় তারা জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।

আইনজীবী মিজবাহ উদ্দিন আরও বলেন, পুলিশের দাবি অনুযায়ী যদি জুবাইদা ও তাঁর মা রেহেনা পুলিশের ওপর হামলা করে থাকেন, তাহলে ফৌজদারি আইনে মামলা করে তাদের গ্রেপ্তার করা যেত। কিন্তু তা না করে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ঘটনাটি উদ্বেগজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিডি/এএন

শেয়ার করুনঃ
Advertisement