অনলাইন কেনাকাটায় ১৭ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড: ই-কমার্সে ফিরছে গ্রাহক আস্থা।
Published : ২০:৩৯, ১৬ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশের রিটেইল অর্থনীতিতে এখন এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লব চলছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগের ফলে এই খাতটি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এবারের ঈদ মৌসুমে ই-কমার্স খাতের এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি কেবল সংখ্যাগত রেকর্ড নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের পর ডিজিটাল অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় ক্রেতাদের মাঝে নতুন করে তৈরি হওয়া আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
তথ্য এবং পরিসংখ্যানের আলোকে এবারের ঈদ বাজার।
Digital Commerce Research and Advocacy Forum (DCRAF)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের ঈদ মৌসুমে অনলাইন কেনাকাটার প্রধান সূচকগুলো গত বছরের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে:
* অর্ডারের পরিমাণ: এবার অনলাইনে প্রায় ২.৫ কোটি (২৫ মিলিয়ন) পণ্য ডেলিভারি হয়েছে, যা গত বছরের ২ কোটির তুলনায় ২৫% বেশি।
* লেনদেনের আর্থিক মূল্য: গত বছরের তুলনায় ২৬% বৃদ্ধি পেয়ে এবারের লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ বিলিয়ন বা ১৭ হাজার কোটি টাকায়।
* তৃণমূলের অংশগ্রহণ: মোট অর্ডারের প্রায় ৩৫% এসেছে ঢাকার বাইরে থেকে, যা প্রমাণ করে নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-কমার্সের বিস্তার এখন তৃণমূল পর্যায়ে অনেক বেশি বৈষম্যহীন ও শক্তিশালী।
ক্যাটাগরিভিত্তিক বিক্রয় বিশ্লেষণ: যা কিনছে মানুষ।
এবারের ঈদে পণ্য বিক্রির ধরণে এক বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন দেখা গেছে:
* লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন (৫৫%): বরাবরের মতো শাড়ি, পাঞ্জাবি ও কসমেটিকস শীর্ষে থাকলেও এবার দেশীয় ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের ঝোঁক ছিল প্রবল।
* ইলেকট্রনিক্স ও গেজেট (৪০% বৃদ্ধি): ইলেকট্রনিক্স বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা, এছাড়া স্মার্টফোন ও নতুন নতুন গেজেটের বড় বাজার তৈরি হয়েছে।
* গ্রোসারি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য (৩৫% বৃদ্ধি): যানজট এড়াতে সাধারণ মানুষ চাল, ডাল, তেলসহ ঈদের প্রয়োজনীয় সব গ্রোসারি আইটেম অনলাইন থেকেই অর্ডার করেছেন।
* হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও ডেকোর (২০% বৃদ্ধি): ঘর সাজানোর সামগ্রী এবং কিচেন অ্যাপ্লায়েন্সের কেনাকাটায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
ক্রেতার প্রোফাইল ও আচরণের ধরন।
এবারের ডাটা বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, অনলাইন কেনাকাটা এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরা মোট অর্ডারের ৭০% সম্পন্ন করেছেন এবং ফ্যাশন ও গ্রোসারি আইটেমে নারী ক্রেতাদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৬৫%)। এছাড়া প্রথমবারের মতো অনলাইন ব্যবহার করছেন এমন ক্রেতার সংখ্যা এবার ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
কেন এই প্রবৃদ্ধি?
তীব্র গরম এবং বিশেষ করে অসহনীয় যানজট এড়াতে ক্রেতারা এখন অনেক বেশি অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছেন। এর পেছনে কাজ করেছে তিনটি বড় কারণ:
* প্রশাসনিক স্বচ্ছতা: সরকার পরিবর্তনের পর ই-কমার্স খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে তদারকি বৃদ্ধি পাওয়ায় মানুষ এখন বড় অংকের কেনাকাটা করতে নিরাপদ বোধ করছে।
* উদ্যোক্তাদের বিশাল নেটওয়ার্ক: ই-ক্যাবের ৩,০০০-এর বেশি নিবন্ধিত সদস্যের পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ ক্ষুদ্র ও এফ-কমার্স উদ্যোক্তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবারের বাজারকে প্রাণবন্ত করেছে।
* সরাসরি বিপণন: সরাসরি বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কম থাকায় পণ্যের দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে ছিল।
ডিজিটাল পেমেন্ট ও অর্থনীতির স্বচ্ছতা।
এবারের ঈদে প্রায় ৬০% লেনদেনই সম্পন্ন হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যমে (বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক কার্ড)। ক্যাশ-অন-ডেলিভারির চেয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের এই ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে যে, দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে ক্যাশলেস ও স্বচ্ছ হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি মূলত ডিজিটাল কমার্স খাতের প্রতি গ্রাহক আস্থারই প্রতিফলন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স ও লজিস্টিকস।
লজিস্টিক খাতের এই সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় ই-কমার্স খাতের পাশাপাশি এখন আন্তর্জাতিক বা 'ক্রস-বর্ডার' ই-কমার্সের নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হচ্ছে। ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অটোমেশন বাড়লে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্য সরাসরি বিশ্ববাজারে পৌঁছানো অনেক বেশি সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।
ই-কমার্স এখন আর কোনো বিকল্প মাধ্যম নয়, বরং এটি দেশের মূলধারার অর্থনীতির এক অপরিহার্য স্তম্ভ। তবে এই প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা এবং ডেলিভারি চার্জ সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা জরুরি।
লজিস্টিক খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে, এই খাত ২০২৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জিডিপিতে বড় ধরণের অবদান রাখতে সক্ষম হবে। নতুন বাংলাদেশের এই ডিজিটাল অগ্রযাত্রা একটি স্মার্ট ও বৈষম্যহীন বাজার ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করছে।
তথ্যসূত্র: Digital Commerce Research and Advocacy Forum (DCRAF) এর নিজস্ব বিশ্লেষণ; যার ভিত্তি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, ই-ক্যাব (e-CAB), শীর্ষস্থানীয় পেমেন্ট গেটওয়ে এবং লজিস্টিক সেক্টরের প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ডাটা ব্যবহার করা হয়েছে।
বিডি/এএন


































