চট্টগ্রামে ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
Published : ১২:৪৮, ৬ অক্টোবর ২০২৬
চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য দিতে হাজির না হওয়ায় বর্তমানে কর্মরত ও বদলি হওয়া প্রায় ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, এসব সদস্য মামলার আসামি নন; সাক্ষ্য নিশ্চিত করতে আদালতের পক্ষ থেকে তাদের তলব ও পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের এর আগে একাধিকবার সমন ও পরোয়ানা পাঠানো হলেও অনেকে আদালতে হাজির না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে আছে।
সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে গত ৩ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে ১৮টি পৃথক স্মারকে চিঠি পাঠানো হয়। এতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের নির্ধারিত দিনে সকাল ৯টায় আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কয়েকজন সাক্ষীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল।
সাক্ষী হিসেবে থাকা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কনস্টেবল থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। কেউ বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মরত, আবার কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেট, চাঁদপুর, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। সিআইডি, পিবিআই, নৌ পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও এসবিতেও কর্মরত রয়েছেন অনেকে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের পতেঙ্গা, কোতোয়ালি, খুলশী, সদরঘাট, হালিশহর, চকবাজার, কর্ণফুলী, ডবলমুরিং, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, আকবরশাহ, বাকলিয়া, পাঁচলাইশ, পাহাড়তলী ও ইপিজেড থানার বিভিন্ন মামলায় এসব পুলিশ সদস্য সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন। মামলাগুলো মহানগর দায়রা জজ আদালত, অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসহ বিভিন্ন বিশেষ আদালতে বিচারাধীন।
হত্যা মামলার বিচারেও দীর্ঘসূত্রতা
২০২২ সালে দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি আদালতের নজরে এসেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তৃতীয় আদালত পুলিশ কমিশনারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের পর বাদীসহ সাক্ষীদের হাজির করতে একাধিকবার প্রসেস জারি করা হলেও রাষ্ট্রপক্ষ তাদের আদালতে হাজির করতে পারেনি। আগামী ১৮ নভেম্বর সাক্ষীদের হাজির করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কমিশনার, সিএমপিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বদলিই বড় বাধা
আদালত সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা পরবর্তী সময়ে অন্য জেলা বা ইউনিটে বদলি হয়ে যাওয়ায় সাক্ষ্যগ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো কর্মস্থলে পাঠানো সমন পরে রিজার্ভ অফিস, সিএমপি সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ইউনিট ঘুরে নতুন কর্মস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে।
পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, দূরবর্তী স্থানে বদলি, অসুস্থতা, সমন যথাসময়ে না পাওয়া কিংবা কোনো কোনো সাক্ষীর মৃত্যুর কারণে আদালতে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ জানান, এসব পুলিশ সদস্য মামলার আসামি নন। সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাদের তলব করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের মামলাগুলোতে পুলিশ সদস্য ছাড়াও বিপুলসংখ্যক সাধারণ সাক্ষী রয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুর রাজ্জাক বলেন, সমন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়া, অবসর গ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে সাক্ষীরা আদালতে অনুপস্থিত থাকতে পারেন। এতে মামলার জট বাড়ে। সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের যাতায়াত ব্যয় ও প্রয়োজনীয় আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরীর মতে, পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য বড় বাধা। দীর্ঘদিন ধরে মামলা ঝুলে থাকলে বিচারপ্রার্থী ও রাষ্ট্র—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রশাসনিক জটিলতা সমাধান করে সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জবাবদিহিও প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।






























