লক্ষ্মীপুরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের দাবি

লক্ষ্মীপুরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের দাবি ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৭:৫১, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাতভর মাছ ধরছে একাধিক নৌকা। এসব মাছ কিনতে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন মাছঘাটে অপেক্ষা করছেন ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ উঠেছে, কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীর সহায়তায় এসব কার্যক্রম চলছে। তবে অভিযুক্তদের কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন সুরক্ষায় ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকায় ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেল ও সন্ধ্যায় রামগতি ও কমলনগরের কয়েকটি মাছঘাট ঘুরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকারের এমন চিত্র দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, রামগতির বিবিরহাট, ওছখালী, ব্রিজঘাট, আসলপাড়া, টাঙ্কিরঘাট, আলেকজান্ডার, বালুরচর ও বাংলাবাজার এবং কমলনগরের মতিরহাট, নবীগঞ্জ, নাজিরগঞ্জ, মাতাব্বরহাট, লুধুয়া ও পাটারিরহাট এলাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে মাছ ধরা হচ্ছে।

রাতভর মাছ শিকারের অভিযোগ
স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রামগতি বাজার মাছঘাট-সংলগ্ন মান্তাপাড়া এলাকায় বিকেলে কয়েকটি নৌকা মাছ ধরতে নদীতে যায় এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে মাছ নিয়ে ঘাটে ফেরে। এ ছাড়া কিছু নৌকা সারা রাত মাছ শিকার করে ভোরে ঘাটে আসে। তখন মাছ কেনার জন্য ব্যবসায়ীদের ভিড় বাড়ে।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, প্রতিদিন প্রায় ৩০টি ছোট-বড় নৌকা মেঘনায় মাছ শিকারে নামে। তাঁদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময়েও প্রায় দুই শতাধিক ব্যবসায়ী ওই এলাকা থেকে মাছ কেনেন।

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, রামগতির মান্তাপাড়া এলাকায় নৌকা পরিচালনার সঙ্গে লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। একইভাবে কমলনগরের মতিরহাটে চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হুমায়ুন কবির ও ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে কয়েকটি নৌকায় মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় দুই বিএনপি নেতা দাবি করেন, কয়েকটি ইউনিয়নের ছাত্রদল ও যুবদলের কিছু নেতাকর্মীও এ কার্যক্রমে জড়িত থাকতে পারেন। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই মাছ শিকার চলছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্ত নেতার
অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল নেতা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনীতি করার কারণে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে অনেকেই রয়েছেন। তাঁকে নিয়ে এমন অভিযোগ কেউ করলেও করতে পারে। তবে তিনি এ কাজের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।

রামগতি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শিবলী নোমান বলেন, সরকারি আইন অনুযায়ী ২২ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাছ শিকারে সহায়তা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, অপরাধীর পরিচয় অপরাধী।

অভিযান জোরদারের আশ্বাস প্রশাসনের
রামগতির বড়খেরী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ আলী বলেন, জনবল সংকটসহ নানা কারণে বিশাল নদী এলাকায় নজরদারি চালানো কঠিন। তারপরও নৌ-পুলিশের সদস্যরা সামর্থ্য অনুযায়ী অভিযান চালাচ্ছেন। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, অভিযুক্তদের কয়েকজনের নাম তিনিও শুনেছেন। গত দুই দিনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় একাধিকবার গিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে টেলিফোনে সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে এবং শুক্রবার থেকে অভিযান আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি তাঁরাও জেনেছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।

সরকারের নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য মা ইলিশের প্রজনন সুরক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো। এ সময়ে মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণন বন্ধ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement