খোকনের সঙ্গে বিতণ্ডায় প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ

খোকনের সঙ্গে বিতণ্ডায় প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১২:২৭, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে পুরো বেঞ্চসহ এজলাস ছাড়ার মতো এক বিরল ঘটনা ঘটেছে। আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার মন্তব্যের জেরে সৃষ্ট এই উত্তেজনার পেছনের মূল কারণ ছিল একটি মামলার তথ্য গোপনের দায়ে জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের এক নম্বর এজলাসে এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে।

ঘটনার সূত্রপাত যে মামলায়
নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) নিয়োগ সংক্রান্ত একটি মামলায় একই আদেশের বিরুদ্ধে বারবার রিট করা এবং আগের রিট খারিজের তথ্য গোপন করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এই প্রতারণার অভিযোগে রিটকারী মো. নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহমেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে আপিল বিভাগ। জরিমানার এই অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে একাধিক রিট করেছিলেন নুর আলম। এই মামলায় রিটকারীর পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।

ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের বক্তব্য
আদালত কক্ষের বাইরে এসে সাংবাদিকদের ব্যারিস্টার খোকন জানান, সকালে জুনিয়র এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয়টি কাম্য ছিল না বলেই তিনি প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।

তিনি বলেন, "তালিকার ১৩ নম্বর মামলা শেষ হওয়ার পর আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আপিল বিভাগে মামলা খুব একটা হচ্ছে না, আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাকে মাফ করে দেন।"

তিনি আরও জানান, আপিল বিভাগে বর্তমানে একটি মাত্র বেঞ্চ চালু থাকায় এবং বেঞ্চ স্বল্পতার কারণে মামলাজট ও শুনানি দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে আইনজীবীরা পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন—এ বিষয়টিই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেলের ব্যাখ্যা ও ভিন্ন চিত্র
ঘটনার পর নিজ কার্যালয়ে ব্রিফিংকালে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, ব্যারিস্টার খোকন আইনজীবীদের কল্যাণের কথা বললেও মূলত আজকের কার্যধারায় সেভাবে বিষয়টি আসেনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "আইনজীবী সুফিয়া আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ীও মামলায় সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন মাহবুব উদ্দিন খোকন। সকালে যখন আদেশ হয়, তখন খোকন আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। পরে বেলা সাড়ে বারোটার দিকে অন্য একটি মামলায় তিনি জরিমানের আদেশ পরিবর্তনের অনুরোধ জানান। তখন আদালত জানান যে, আগের আদেশ গোপন করে সিরিয়াস ফ্রড (প্রতারণা) করা হয়েছে, তাই আদেশ পরিবর্তন করা হবে না।"

অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্যমতে, এরপর ব্যারিস্টার খোকন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে বলে বসেন যে, 'আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।' তখন প্রধান বিচারপতি একে আদালত অবমাননার শামিল হিসেবে উল্লেখ করে অন্যদের নিয়ে এজলাস ত্যাগ করেন।

সুপ্রিম কোর্টের প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য আইনজীবীদের মন্তব্য
রেজিস্ট্রার জেনারেল: মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানান, গুরুতর জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের অভিযোগে উচ্চ আদালতে অভিযুক্তদের জরিমানার আইনি নজির অতীতেও রয়েছে।

সিনিয়র আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন: তিনি মন্তব্য করেন যে, বার সভাপতি হিসেবে ব্যারিস্টার খোকন আইনজীবীদের কষ্টের কথা বললেও, প্রকাশ্য আদালতে এমন বিষues অবতারণা না করে অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়টি আলোচনা করতে পারতেন। এটি পুরো অঙ্গনের জন্য খুব একটা ভালো বার্তা বহন করে না।

এর আগে গত ২০ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে আইনজীবীদের পেশাগত নিষ্ঠা, মামলার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং দায়িত্বশীলতা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।

সূত্র: আমার দেশ

শেয়ার করুনঃ
Advertisement