আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাড়াতে জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার
Published : ১৫:৫৯, ১১ অক্টোবর ২০২৬
দেশের সমুদ্রবন্দর, নদীবন্দর ও স্থলবন্দরের ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার নিশ্চিত করতে জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার। দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এ কৌশলপত্র তৈরি করা হচ্ছে।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি বলেছেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বন্দরগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বন্দর পরিচালনায় কার্যকর পরিকল্পনা, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, বাংলাদেশে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কান্ট্রি ডিরেক্টর তাকাহাশি, বিভিন্ন বন্দরের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
সব পক্ষের মতামতে তৈরি হবে বন্দর কৌশল
নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থার কর্তৃত্ব ও দায়িত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিদ্যমান আইনগত কাঠামো ও দায়িত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিচালনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের এ প্রয়োজন বিবেচনায় সরকার জাতীয় বন্দর কৌশল চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস এবং আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কার্যকর কৌশল প্রণয়নে সব অংশীজনের মতামত গ্রহণ করা জরুরি।
তাঁর মতে, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে এককভাবে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন ব্যাহত হতে পারে। তাই দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
বন্দর কৌশল প্রণয়নে সহযোগিতা করছে জাইকা
জাতীয় বন্দর কৌশল তৈরিতে জাইকা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সহযোগিতা করছেন বলে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী। বাংলাদেশের উন্নয়ন অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা জাপানের এ সহযোগী সংস্থার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কার্যকর কৌশলপত্র তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, এ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু বন্দরগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; বরং পরিচালনা, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা
বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও পরিচালন অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ড, ডেনমার্কের এপি মোলার এবং সিঙ্গাপুরের পিএসএর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা দেশের বন্দরগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ, ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পণ্য খালাসে দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ
মন্ত্রী বলেন, বন্দর উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। টার্মিনাল পরিচালনা, কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পণ্য খালাস, পরিবহন সংযোগ, কাস্টমস কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করে বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়লে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, উদ্যোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও গতিশীল হবে।
শেখ রবিউল আলমের মতে, বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জাতীয় বন্দর কৌশল তৈরির সময় উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, আমদানি-রপ্তানিকারক এবং অন্যান্য ব্যবহারকারীর প্রয়োজন ও স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সমন্বিত পরিকল্পনার গুরুত্ব
নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বন্দর কৌশল কোনো একক মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের বিষয় নয়। দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি এ উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং জাইকার প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি কৌশল প্রণয়নের কাজে সংশ্লিষ্ট সবার মেধা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সর্বোত্তম ব্যবহারের আহ্বান জানান।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ও সমন্বিত জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। এ কৌশল বাস্তবায়িত হলে বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার এবং জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

































