ঢাবিতে তোফাজ্জল হত্যা: আটক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জালালের ঘর-বাড়িই নেই গ্রামে
Published : ২১:৫২, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) মানসিক প্রতিবন্ধীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আটক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জালাল আহমেদের পারিবারিক কাহিনী খুবই করুণ। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী এই শিক্ষার্থীর পড়াশুনার খরচ চলতো দান-ভিক্ষায়। গ্রামের বাড়িতে নেই ঘর বা জায়গা জমি। মেধাবী ওই শিক্ষার্থীর কর্মকান্ডে হতবাক স্থানীয়রা। তারাও চায় জালালের কর্মের জন্য শাস্তি চায় স্থানীয়রাও।
সরেজমিনে ঢাবির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী জালাল আহমেদের টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার আনেহলা ইউনিয়নের সাইটশৈলা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সে ওই গ্রামের আলতাফ হোসেন চৌধুরীর ছোট ছেলে তিনি।
জালালের বাবা-মা ভাইয়ের থাকার মত কোন জায়গা জমি নেই গ্রামের বাড়িতে। বড় ভাই আল-আমিন তার স্ত্রী নিয়ে অন্যজনের বাড়িতে থাকেন। তার বোনের বিয়ে হয়েছে নারান্দিয়াতে। জালালের প্রতিবন্ধি বাবা আলতাফ অসুস্থ মাকে নিয়ে থাকেন ভূঞাপুর উপজেলার নিকরাইল ইউনিয়নের পাথাইলকান্দি এলাকায় ১৫শ’ টাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। ওই পাথাইলকান্দি বাজারেই তার বাবা-মা চাপড়া বিক্রি করেন।
ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার পর জালাল এলাকায় বেশি যেতেন না। সরকার পতনের পর জালাল গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। বাড়ি না থাকায় গ্রামে তিনি ৪-৫দিন ছিলেন বিভিন্ন বন্ধুদের বাড়িতে। এলাকায় ভদ্র, নম্র ও মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিল জালাল। মেধাবী হওয়ায় গ্রামের মানুষজন তার লেখাপড়ার খরচ যোগান দিতো। এছাড়া তার বাবাও যতটুকু পেরেছেন দিয়েছেন ছেলের পড়াশুনার খরচ। সম্প্রতি তার বাবা চাপড়া বিক্রি ৬ হাজার টাকা দিয়েছিলেন জালালকে। তবে ঢাকায় কোন রাজনীতি জড়িত ছিল কিনা সেটাও জানতো না এলাকার মানুষজন বা তার আত্মীয় স্বজনরা। তার বাবা বিএনপি’র সমর্থক ছিলেন। কিন্তু ছেলে ছাত্রলীগে গিয়েছেন এটাও ঘটনার পরই জেনেছে স্থানীয়রা।
জানা গেছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মানসিক প্রতিবন্ধী তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যায় জড়িত জালাল আহমেদ ঘাটাইলের সাইটশৈলা সরকারি প্রাথমিক ও সাইটশৈলা উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি পাশ করার পর এলেঙ্গার শামছুল হক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাবিতে ভর্তি হয়। এরপর থেকেই পরিবর্তন ঘটে জালালের। স্থানীয়দের সহায়তা ও বাবার দেয়া সামন্য খরচ এবং টিউশনি করে পড়াশুনার খরচ চালানো জালাল এখন হত্যা মামলার আসামি।
স্থানীয়রা জানায়, এলাকার মানুষের কাছে জালাল একজন উদাহরণ দেয়ার মত ছাত্র ছিল। কিন্তু একটি ঘটনায় তার এবং তার পরিবারের আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে। মেধাবী জালাল এখন খুনের দায়ে পুলিশের হাতে আটক। এলাকার মানুষ টিভিতে না দেখলে এটা বিশ্বাসই করতো না।
সাইটশৈলা গ্রামের কায়কোবাদ হোসেন বলেন, জালাল খুবই মেধাবী ছিল। স্থানীয়রা টাকা পয়সা তুলে তার পড়াশুনার খরচ চালিয়েছে। গ্রামে কোন রাজনীতি করতো না। তার বাবা বিএনপি সমর্থন করতো। তবে ছেলেটা কেন বা কিভাবে রাজনীতিতে গেল সেটা অবাক করার মত। কাউকে এভাবে পিটিয়ে মারবে সে এটা কল্পনা করার মত না। ঘটনাটি টেলিভিশনে দেখে হতবাক হয়েছি।
জালালের চাচা চান মিয়া বলেন, কয়েক বছর ধরে তাদের সাথে যোগাযোগ নেই। গ্রামে মাঝে মাঝে আসে কিন্তু তেমন কথা হয় না। হঠাৎ সাইটশৈলা বাজারের টিভিতে দেখলাম সে একটা ছেলেকে মারধর করছে। এটা ঠিক করেনি। ঘটনার শাস্তিতো সে পাবেই। আমরাও এই ঘটনার শাস্তি চাই।
জালালের মা কহিনুর বেগম বলেন, ছেলেকে বুঝিয়েছি অনেক সে যেন কারোর সাথে খারাপ আচরণ বা কাউকে আঘাত না করে। মানুষের অন্যয় না করতে বারবার বুঝিয়েছি। ঘটনাটি দেখিনি তবে শুনেছি মেয়ের কাছে। আমার ছেলেকেও যদি এভাবে মারধর করতো তাহলে সেই কষ্টতো আমারও হতো। আল্লাহ তার কপালে খুন লেখেনি।
বাবা আলতাফ হোসেন বলেন, সবই আমার ভাগ্য। জায়গা জমি নেই থাকার মত। গ্রামের বাড়ির বাজারে চা বিক্রি করেছি। চা বানানোর জন্য হাতের আঙ্গুল কেটে যায়। পরে চা আর বিক্রি করতে পারিনি। অন্যের বাড়িতে থেকেছি। পরে পাথাইলকান্দিতে চাপড়া বিক্রি করি স্ত্রীর সহযোগিতায়। ছোটবেলা থেকেই ছেলেটা কষ্ট করে পড়াশুনা করেছে। অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে নিয়ে। সে চাকরি-বাকরি করবে। আমাদের জন্য না হোক সে যেন পড়াশুনা শেষ করে নিজেই ভালভাবে চলতে পারে। কিন্তু সব কিছুই শেষ হয়ে গেল। আশা ধ্বংস করে দিল এক নিমিষেই। ছেলে পুলিশে আটক হয়েছে জেনেছি। কিন্তু কে তার খোঁজ নিবে। আমিতো প্রতিবন্ধি মানুষ আমার পরিবারে তেমন কেউ নেই ছেলেটার খোঁজ নিবে। ঢাকায় রাজনীতি করতো কিনা জানি না।
বিডি/এন






























