ইতালির শহরগুলোতে ৫ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন, বিক্ষোভ ঘিরে জোরদার নিরাপত্তা
Published : ১২:৪৭, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
বিক্ষোভের আড়ালে সহিংসতা ও লুটপাট ঠেকাতে ইতালির রোম, মিলানসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের পাশাপাশি পাঁচ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করেছে সরকার। শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও বড় ধরনের সহিংসতা বা লুটপাটের খবর পাওয়া যায়নি। গত সপ্তাহের সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নেওয়া কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে অনেকাংশে সফল বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
ইতালির সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, শনিবার মিলান, রোম ও তুরিনসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। আগের সপ্তাহে একই ধরনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। এবার তা প্রতিরোধে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করা হয়।
মিলানে বিক্ষোভ মূলত শান্তিপূর্ণ থাকলেও রোম ও তুরিনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব ঘটনা বড় আকার ধারণ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিলানে বিক্ষোভ ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি বিলাসবহুল বিপণিবিতান ও দোকানগুলোর কাচের জানালায় কাঠের তক্তা লাগানো হয়। বিকেলের দিকে অধিকাংশ দোকান খুলে দেওয়া হলেও অ্যাপল স্টোর বন্ধ ছিল। ওমেগা, টিফানি ও গুচির মতো ব্র্যান্ডের দোকানগুলোর সামনেও নেওয়া হয় বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
গত সপ্তাহান্তে শহরের কেন্দ্রীয় দুওমো স্কয়ারের আশপাশের বিভিন্ন দোকানে ঢুকে স্নিকার্স, খেলাধুলার পোশাক ও ক্রীড়াসামগ্রী লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবার শহরের কেন্দ্রের বাইরেও নিরাপত্তা কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বিক্ষোভের নামে সহিংসতা ও লুটপাট প্রতিরোধে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে মিলানে আরও ৫০০ সেনা মোতায়েন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান কঠোর করার উদ্যোগ রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের সহিংসতায় জড়িতদের বড় একটি অংশ ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে মিলানে কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটকও করেছে পুলিশ বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মিলান পুলিশের তথ্য অনুসারে, গত সপ্তাহের সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় প্রায় দুই হাজার তরুণ বিক্ষোভকারী জড়িত ছিল। দুই দিনে ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে ৩৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। অভিযুক্তদের মধ্যে বিদেশি নাগরিক এবং ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়া দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীরাও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় মিলানে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী সমবেত হয়ে প্রধানমন্ত্রী মেলোনির বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তাঁদের বহন করা একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘রাষ্ট্রের মিথ্যাচার মানি না’। স্থানীয় টেলিভিশনের ফুটেজে একদল বিক্ষোভকারীকে জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যালয়ের সামনে গোবর ফেলতে এবং সরকারের সাফল্যের প্রচারসংবলিত একটি বড় বৈদ্যুতিক বিলবোর্ডে আগুন দিতে দেখা গেছে।
এদিকে ‘ইন্টার মিলান’ ফুটবল ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু উগ্র ডানপন্থী ব্যক্তি অল্প সময়ের জন্য সেখানে উপস্থিত হয়ে অভিবাসী ও মুসলিমবিরোধী স্লোগান দেন। পুলিশ দ্রুত তাঁদের অন্য বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে আলাদা করে দেয়।
মিলানে শনিবারের কর্মসূচিতে অংশ নেন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেওয়া পিয়েরফ্রান্সেস্কো মাজোরিনো। তিনি ২০২৭ সালের শুরুর দিকে মধ্য-বামপন্থী জোটের প্রাথমিক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। ২০১৬ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান মেয়র জিউসেপ্পে সালা আগামী নির্বাচনে আর অংশ নেবেন না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মিলানে নিরাপত্তা জোরদারে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা সেনাদের সঙ্গে শনিবার আরও ৫০০ সেনা যোগ দেন। তাঁরা শহরে দায়িত্ব পালনরত প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকে সহায়তা করেন। পাশাপাশি ড্রোন দিয়ে নজরদারি, রেলস্টেশনে তল্লাশি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল মোতায়েন এবং অনলাইনে সহিংসতায় উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো জানান, সম্প্রতি মোতায়েন করা সেনাদের প্লাস্টিকের রেস্ট্রেইন্ট টাই ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই অনুমতি শুধু রেলস্টেশনের আশপাশের এলাকায় সীমাবদ্ধ, পুরো শহরে নয়। সেনাদের পিপার স্প্রে বা টেজার ব্যবহারের অনুমতি নেই বলেও জানান তিনি।
শনিবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভকারীরা শহরের কেন্দ্র থেকে তিন কিলোমিটারেরও বেশি দূরে মিলান পলিটেকনিকের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল শেষ করেন।
অন্যদিকে রোমেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বিলাসবহুল কেনাকাটার জন্য পরিচিত কয়েকটি সড়ক বন্ধ করে দেয় এবং সার্কাস ম্যাক্সিমাস ও পিয়াজ্জা দেল পোপোলোর আশপাশে নজরদারি বাড়ায়।
ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে থাকলেও শনিবার ইউরোপের বিভিন্ন শহরেও বড় সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। মিলান, রোম, মাদ্রিদ, লিসবন ও তিরানায় অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচিতে শিক্ষা, দুর্নীতি, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, পেনশন ও আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি উঠে আসে।
সূত্র: এপি, এনডিটিভি।

































