উখিয়ায় ১ লাখ ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস পুলিশের

উখিয়ায় ১ লাখ ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস পুলিশের ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার প্রতিনিধি

Published : ১২:০৫, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়ায় এক ব্যক্তিকে আটকের সময় দেড় লাখ পিস ইয়াবা ও একটি নাইন এমএম পিস্তল উদ্ধারের দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে উখিয়া থানা-পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, নেই পিস্তলের কোনো তথ্য। এ নিয়ে উদ্ধার হওয়া এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাৎ এবং অস্ত্র জব্দের তালিকায় না রাখার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, কক্সবাজারের উখিয়ার খ্যাংখালী স্টেশন পেরিয়ে সামনে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থামিয়ে ছৈয়দুল বশর ওরফে ছিছিকে আটক করে পুলিশের একটি দল। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) কিবরিয়া।

ছৈয়দুল বশর পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়ার আব্দুস ছবুরের ছেলে এবং ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য। স্থানীয়দের দাবি, তিনি উখিয়ার শীর্ষ মাদক কারবারিদের একজন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, অটোরিকশাটি থেকে ১৫ কার্ডে মোট দেড় লাখ পিস ইয়াবা এবং একটি নাইন এমএম পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে পরে পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইয়াবার পরিমাণ ৫০ হাজার পিস উল্লেখ করা হয়। অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিও বিজ্ঞপ্তিতে নেই।

অভিযোগ উঠেছে, উদ্ধার হওয়া ইয়াবার এক লাখ পিস জব্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, ওই ইয়াবা পরে মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া পিস্তলটি জব্দের তালিকায় না রাখার বিনিময়ে আটক ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এসআই কিবরিয়া।

উখিয়া থানা-পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী জোড়া ব্রিজের পশ্চিম পাশে একটি অস্থায়ী চেকপোস্টে তল্লাশির সময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটিকে থামার সংকেত দেওয়া হয়। এ সময় চালকসহ তিনজন পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া করে ছৈয়দুল বশরকে আটক করে। অন্য দুজন পালিয়ে যান।

বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরে অটোরিকশার চালকের আসনের নিচে রাখা একটি সাদা বস্তা থেকে পাঁচটি কার্টনে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা কয়েকজনের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের বিজ্ঞপ্তির তথ্যের অমিল রয়েছে। তাঁদের দাবি, খ্যাংখালী স্টেশন থেকে ছৈয়দুল বশরকে আটকের সময় ইয়াবার পরিমাণ ছিল দেড় লাখ পিস এবং একটি নাইন এমএম পিস্তলও উদ্ধার করা হয়েছিল।

ইয়াবার এক লাখ পিস আত্মসাতের অভিযোগে এসআই কিবরিয়ার পাশাপাশি সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সজিবুল ইসলাম ও কনস্টেবল মোহাম্মদ সুজনের নামও এসেছে। স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, জব্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়া ইয়াবাগুলো ঘটনার রাতেই একটি মাদক কারবারি চক্রের কাছে প্রায় এক কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট অভিযোগের পক্ষে কোনো নথির তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এসআই কিবরিয়া দীর্ঘদিন ধরে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ি ও উখিয়ায় কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, সীমান্তের মাদক কারবারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া এবং মাদক সরানোর অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উপজেলা ছাত্রদল নেতা মাহবুব আহমদ শাকিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, কিবরিয়া আগে সীমান্তের চোরাকারবারিদের সহযোগী ছিলেন এবং এখনো আছেন বলে তাঁর দাবি। স্থানীয় যুবক ওসমান সরওয়ারও এক লাখ পিস ইয়াবা গায়েবের অভিযোগকে সত্য বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, কিবরিয়া নাকি বলে বেড়াচ্ছেন, কেউ তাঁর কিছু করতে পারবে না।

স্থানীয় সাংবাদিক রফিক উদ্দিন ফেসবুকে ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখেন, ‘৫০ হাজার নাকি ১ লাখ ৫০ হাজার?’ তাঁর পোস্টের মন্তব্যে কয়েকজন দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করেন।

এর আগে ১৭ আগস্ট এক মাদকবিরোধী র‍্যালিতে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেছিলেন, ‘হয় মাদক ছাড়ুন, নইলে উখিয়া ছাড়ুন।’ তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই বক্তব্যের পরও উখিয়া ও আশপাশের এলাকায় মাদকের বিস্তার কমেনি। তাঁদের দাবি, এলাকাটি মাদক কারবারের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে।

এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসিম আজাদ। তিনি বলেন, উখিয়া থানা-পুলিশের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে জব্দ করা ইয়াবা গায়েবের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যাঁদের দায়িত্ব মাদক নিয়ন্ত্রণ করা, তাঁদের বিরুদ্ধেই এমন অভিযোগ ওঠা দুঃখজনক।

সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নীতিটির যথাযথ প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে ঘটছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কিবরিয়াকে একাধিকবার ফোন করা হয়। প্রথমদিকে তিনি ফোন ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিতভাবে অভিযোগগুলো জানিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও জবাব পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদন তৈরির সময় আবার ফোন করা হলে কিবরিয়া বলেন, তিনি বিষয়টি জানেন এবং আগের দিন থেকে এ বিষয়ে অন্তত ৫০টি ফোন পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা তদন্ত করে যা পান, তা লিখেন।’ তবে এক লাখ পিস ইয়াবা গায়েব, পিস্তল জব্দের তালিকায় না রাখা কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, তিনি আগের চার দিন ছুটিতে ছিলেন। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে। তাঁকে জড়িয়ে এ ধরনের প্রচারকে অপরাধ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ওসি বলেন, তাঁরা এলাকায় মাদক নির্মূল করতে কাজ করছেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. অহিদুর রহমান বলেন, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত থাকলে তা দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বিজিবি বা অন্য কোনো বাহিনী মাদক জব্দ করলে সাধারণত এভাবে ব্যাপক অভিযোগ ছড়ায় না; পুলিশ অভিযান চালালেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। এ কারণে উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় দায়িত্ব পালন ও অভিযান পরিচালনায় অনেক কর্মকর্তা অনাগ্রহী বা ভীত হন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement