যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পাঁচ কারণ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পাঁচ কারণ ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Published : ১১:১৫, ৫ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কাছে হেরেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কিছু আসন হারায়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়কে ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনামলের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কৌশল এবং হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন হারানো।

বিবিসির এক বিশ্লেষণে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

১. জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ

নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। জ্বালানি, খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের বক্তব্যেও সেই ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা গেছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে ডিজেলের গড় খুচরা দামও রেকর্ড পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।

নির্বাচনী জরিপেও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে তাঁরা বা তাঁদের পরিবার মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি এ পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ কমাতে না পারার বিষয়টি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

২. ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ

রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ইরান যুদ্ধ। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের ওপরও।

যুদ্ধের বিষয়ে মার্কিন নাগরিকদের বড় একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) গোষ্ঠীর অনেকেই সামরিক অভিযানকে তাঁর ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ফলে ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে সমর্থকদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয়।

এক জরিপে ৬৩ শতাংশ মার্কিনি জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পও যুদ্ধের প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তাঁর সামনে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।

৩. ভোটারদের মন বুঝে প্রচারণা চালিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে তাদের প্রচারণার কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাতীয় রাজনীতির বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সামনে নিয়ে আসেন দলটির প্রার্থীরা।

জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবার খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে প্রচারণার কেন্দ্রে রাখা হয়। এতে ভোটারদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক উদ্বেগের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে পেরেছেন তাঁরা।

টেক্সাসের সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং কানসাসের যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিষয়গুলো সামনে রেখে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় অপ্রত্যাশিত জয় পান সাবেক শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। তাঁর প্রচারণায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পায়।

মিশিগানে জয়ী আবদুল এল-সায়েদ রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন। অন্যদিকে, জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত সিনেটর জন অসফ জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতির বিষয়কে প্রচারণার মূল আলোচনায় রাখেন।

জর্জিয়ায় ট্রাম্প দুবার জয়ী হলেও ৩৯ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট নেতার জয় নির্বাচনে দলটির প্রচারণার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণার কৌশল যে প্রভাব ফেলেছে, তা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন ট্রাম্পও। প্রতিপক্ষের নির্বাচনী প্রচারণার প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা ভালো কাজ করেছেন। বিপরীতে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী সাধারণ ভোটারদের প্রধান উদ্বেগগুলো যথাযথভাবে গুরুত্ব না দেওয়ায় সমালোচিত হয়েছেন।

৪. ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার প্রভাব পড়েছে প্রার্থীদের ওপর

মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য আরেকটি বড় বাধা ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা। মূল্যস্ফীতি ও ইরান যুদ্ধের মতো বিতর্কিত ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে তাঁর দলের প্রার্থীদের ওপরও।

শুধু বিরোধী দলের সমর্থকদের মধ্যেই নয়, রিপাবলিকানদের নিজস্ব ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে সমর্থন দেওয়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এবার রিপাবলিকান প্রার্থীদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প ভোটারদের এমনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন ব্যালটে তাঁর নিজের নাম রয়েছে। কিন্তু এই কৌশল প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তও দলটির জন্য নেতিবাচক হয়েছে।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে আসে, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে ট্রাম্পের আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন অধিকাংশ ভোটার। অথচ ওয়াশিংটন ডিসিতে নির্বাচনের আগে দেওয়া শেষ ভাষণে তিনি লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুল সংস্কারের বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের তুলনায় এমন বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ভোটারদের প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়।

৫. হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন কমেছে

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন পেয়েছিল রিপাবলিকান পার্টি। ট্রাম্পের জয়ের পেছনে এই জনগোষ্ঠীর ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সমর্থনে পরিবর্তন দেখা গেছে।

বিশেষ করে টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক-অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের জয় রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ওই অঞ্চলের তিনটি আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।

এ ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত কাউন্টিগুলোতেও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। অভিবাসন আইন প্রয়োগ ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড নিয়েও ভোটারদের অসন্তোষ এই পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক সংকট, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীর সমর্থনে পরিবর্তন—এসব বিষয় রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। বিবিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শুধু বিরোধী দলের প্রচারণা নয়, নিজেদের শাসনামলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ভোটারদের প্রত্যাশার সঙ্গে দূরত্বও দলটির পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement