ইসলামী ব্যাংকে ২০১৭-২০২৪ সময়ে নিয়োগে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে
Published : ১৩:০৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়োগবিধি অনুসরণ না করার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনটি ইতোমধ্যে গভর্নরের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা এবং প্রার্থী বাছাইয়ের প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের মোট কর্মী ছিল ২১ হাজার ৫৫১ জন। এর মধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ওই বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগ পান। তাঁদের মধ্যে ৪৬৬ জন লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে এবং ১০ হাজার ৩৩৬ জন সরাসরি প্রবেশ পর্যায়ে নিয়োগ পান।
ইসলামী ব্যাংকের প্রচলিত নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদনকারীদের কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দেওয়া এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান ছিল। উভয় পরীক্ষায় অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়াকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখিয়ে নিয়োগের বিধান
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়। নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখা দিলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এন্ট্রি লেভেল ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে জনবল নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিধানের মাধ্যমে মূল নিয়োগবিধির ৭.০১ ধারায় থাকা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও আবেদন গ্রহণের নিয়ম অনেক ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণত সীমিতসংখ্যক লেটারাল এন্ট্রি বা বিশেষায়িত পদে নিয়োগের সুযোগ থাকলেও ইসলামী ব্যাংকে একই বিধানের আওতায় প্রবেশনারি পর্যায়েই ছয় হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম থেকে নিয়োগের বড় অংশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৮ হাজার ৯৯ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জন পটিয়ার বাসিন্দা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রার্থীদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ফলে নিয়োগে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রার্থীদের বড় উপস্থিতি তৈরি হয়।
সিভি সংগ্রহে বিশেষ ব্যবস্থা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনের সময় ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জ কার্যালয়ে বিভিন্ন বাক্স রাখা হতো।
এসব বাক্সে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গন্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘মহিলা-ক্যাশ’, ‘নারী’ ও ‘ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন পরিচয় লেখা ছিল বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
জমা দেওয়া সিভি থেকে বাছাই করা প্রার্থীদের পরবর্তী সময়ে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো এবং সেখান থেকে নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও বিধি অনুসরণ হয়নি
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ইসলামী ব্যাংকের ২৬টি প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচের মধ্যে ২৪তম ব্যাচের নিয়োগে প্রচলিত নিয়োগবিধি অনুসরণ না করার তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১৯ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে ৮৪০ জন প্রার্থীর তালিকা প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগকে। পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন।
ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী পাস নম্বর ছিল ৫০ শতাংশ। কিন্তু মাত্র ৩৬ জন সেই নম্বর অর্জন করেন। পরে পাস নম্বর ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৩০৪ জন।
এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই আরও ১২ জনকে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ১৮৪ জন পরে চাকরিতে যোগ দেন। বাকি ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও কয়েক হাজার নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি ছিল না
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২ হাজার ২৩২ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল), ২ হাজার ৮২৮ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) এবং ৫০১ জন ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রেও জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি বলে পরিদর্শনে তথ্য পাওয়া গেছে।
লেটারাল এন্ট্রির মাধ্যমে একই সময়ে ৪৬৬ জন নিয়োগ পান। তাঁদের মধ্যে ২৬৪ জন চট্টগ্রাম জেলার প্রার্থী ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিদর্শনের সময় ওই সময়ে ঢাকায় কর্মরত ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্যও নেওয়া হয়। তাঁদের সবাই সিভি জমা দিয়ে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন কোনো মৌখিক পরীক্ষায়ও অংশ নেননি বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন।
উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতিতেও যোগ্যতার প্রশ্ন
সাধারণ কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ না করার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আগের পদে কমপক্ষে দুই বছরের অভিজ্ঞতা এবং মোট ২০ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রয়েছে।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত আকিজ উদ্দিন আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। ডিএমডি হওয়ার আগে আগের পদে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল এক বছর চার মাস।
অন্যদিকে ডিএমডি মিফতাহ উদ্দিনের মোট অভিজ্ঞতা ছিল ১৭ বছর এবং আগের পদে অভিজ্ঞতা ছিল এক বছর—যা সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি যুক্ত থাকে না। এটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। তবে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ভূমিকা পালন করে।
তিনি বলেন, পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর অনিয়ম পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা
২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বহিঃনিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫ হাজার ৩৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং তাঁরা সবাই উত্তীর্ণ হন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া কর্মীদের কয়েকজন পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী সহকর্মীদের বাধা, হুমকি ও হয়রানি করেন। কর্মবিরতি, বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগও ওঠে।
পরবর্তীতে ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইন বলেন, কর্মীদের শুধু নিয়োগ বৈধ না অবৈধ—এই বিবেচনায় চাকরিচ্যুত করা হয়নি। তাঁদের নিয়োগের সময় সার্ভিস রুল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ হিসেবে বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মীরা পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং অন্যদের অংশগ্রহণেও বাধা দিয়েছেন। এ কারণে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।


































