ঢাকার ফুটপাতে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ, দখল বাণিজ্য বন্ধে জরুরি পদক্ষেপের দাবি

ঢাকার ফুটপাতে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ, দখল বাণিজ্য বন্ধে জরুরি পদক্ষেপের দাবি

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৭:৫৬, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানী ঢাকার ফুটপাত দখল ও হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ফুটপাতকেন্দ্রিক এই চাঁদাবাজির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। তবে এই বিপুল অর্থের প্রবাহ, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে কার্যকর তদন্ত ও স্থায়ী সমাধানের দাবি উঠেছে।

বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় হকারের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। ঈদকে কেন্দ্র করে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছায় বলে দাবি করা হয়। প্রতিদিন গড়ে একজন হকারের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে আদায় করা হলে দৈনিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ কোটির বেশি টাকা। এ হিসাবে বছরে চাঁদাবাজির অঙ্ক কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

এর আগে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইজিডি) এক গবেষণায় ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির পরিমাণ বছরে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে হকারের সংখ্যা, ব্যবসার বিস্তার ও আদায়ের পরিমাণ বাড়ায় এই অঙ্ক ৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে এসব হিসাবের নির্ভুলতা ও বর্তমান পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, গোলাপ শাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। দোকানের আকার ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কোথাও বিদ্যুতের বাল্ব ব্যবহারের জন্য ১০০ টাকা এবং নিরাপত্তার নামেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ পুলিশ, নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি বা ‘লাইনম্যান’ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মধ্যে ভাগ হয়। একটি প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, এই বণ্টনে পুলিশের অংশ ৩০ শতাংশ, নিয়ন্ত্রণকারীদের ৪০ শতাংশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ৩০ শতাংশ। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। পুলিশ ও সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা সাধারণত এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়।

ফুটপাত দখল উচ্ছেদে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ী সমাধান আসেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযানের পর কিছুদিন ফুটপাত চলাচলের উপযোগী থাকলেও আবার দখল ফিরে আসে। ফলে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, যানজট বাড়ে এবং নগরজীবনে দুর্ভোগ তৈরি হয়।

দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধে করণীয়
বিশেষজ্ঞ ও নগর-পরিকল্পনাসংশ্লিষ্টদের মতে, ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধে কেবল উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।

প্রথমত, হকারদের নিবন্ধন, পরিচয়পত্র ও নির্ভরযোগ্য ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। নির্ধারিত স্থানে ব্যবসার অনুমতি দিয়ে সরকারি ফি আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজির সুযোগ কমে।

দ্বিতীয়ত, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট, লাইনম্যান এবং সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে প্রমাণসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

তৃতীয়ত, ফুটপাতের ব্যবহার নির্ধারণে নির্দিষ্ট জোন, সময়ভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা এবং বিকল্প হকার মার্কেট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে হকারদের জীবিকা বজায় রাখার পাশাপাশি পথচারীদের চলাচলের অধিকারও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

চতুর্থত, সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাগরিক প্রতিনিধি ও হকার সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত নজরদারি এবং ধারাবাহিক প্রয়োগ ছাড়া ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা কঠিন।

ফুটপাত মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য। হকারদের জীবিকা এবং নগরবাসীর চলাচলের অধিকার—দুই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিক কার্যক্রমই পারে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে।

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement