বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের পথে লিবারেলদের অন্তর্দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের পথে লিবারেলদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ০৫:৪১, ৬ জানুয়ারি ২০২৬

গত ১১ আগস্ট রাতে ঘটে এক চমকপ্রদ ঘটনা। সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাহারা চৌধুরী নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে (নাম ব্যবহার করেন ‘এন্টার্কটিকা চৌধুরী’) ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক আসিফ মাহতাব উৎসকে লক্ষ্য করে দুটি কার্টুন ক্যারিকেচার প্রকাশ করেন। সেখানে দুই শিক্ষককে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষকরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাহারা চৌধুরীকে বহিষ্কার করে।

কিন্তু এখানেই বিতর্ক নতুন দিকে মোড় নেয়। সাহারার একটি অনলাইন মেনিফেস্টোতে পাশ্চাত্যের জঙ্গি গোষ্ঠীর আদলে সন্ত্রাসবাদকে রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে ঘোষণা করা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার ১৬২ জন নাগরিক একটি বিবৃতি দিয়ে তাকে সমর্থন করেন। আশ্চর্যের বিষয়, তারা সন্ত্রাসবাদের নিন্দা না জানিয়ে উল্টো ভুক্তভোগী দুই শিক্ষককে অপরাধী আখ্যা দেন। একইসঙ্গে সাহারার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার এবং দুই শিক্ষককে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করারও দাবি তোলেন।

বিস্ময়করভাবে, এই বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ছিলেন বহু বামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী। অথচ তাদের কাউকে কখনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অধিকার রক্ষায় দাঁড়াতে দেখা যায়নি। এবারও হত্যার হুমকি পাওয়া শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরং হুমকিদাতার পক্ষ নেওয়া এবং ভুক্তভোগীদেরই দোষারোপ করা—ভিকটিম ব্লেমিংয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

এই প্রবণতা বাংলাদেশের বাম-লিবারেল গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন নয়। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের সময়ও একই ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও আন্দোলনটি দ্রুতই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার মঞ্চে রূপ নেয়। শাহবাগে স্লোগান, পোশাক ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষের হাতিয়ার বানানো হয়। এমনকি এক ইসলামবিদ্বেষী ব্লগার ‘থাবা বাবা’কে শহীদ আখ্যা দিয়ে উদযাপন করা হয়। ফলে আন্দোলনটি অনেকের কাছে মুসলিম সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

একইভাবে এনজিও রাজনীতি সাধারণ মানুষের কাছে প্রগতিশীলতার বদলে এলিট আধিপত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। নারীর অধিকার, উন্নয়ন প্রকল্প বা বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় গ্রামীণ জনগণ এসবকে প্রায়ই তাচ্ছিল্য বা হুমকি হিসেবে দেখেছে। এর উদাহরণ হলো—এলজিবিটিকিউ আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কিংবা মসজিদ–মাদরাসার পাশ কাটিয়ে কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন।

নারীর অধিকার নিয়েও একই দ্বিমুখী আচরণ লক্ষণীয়। পশ্চিমে হিজাব পরা নারীদের বৈচিত্র্যের প্রতীক হিসেবে উদযাপন করা হলেও দেশে হিজাবকে ‘অশিক্ষা’ বা ‘চাপের ফল’ বলে অবমূল্যায়ন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ধর্মীয় চর্চাকারী শিক্ষার্থীদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়, অথচ প্রগতিশীল শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক সেমিনারে গিয়ে মুক্ত মতপ্রকাশের বড় বড় বক্তৃতা দেন।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট—অভিজাত প্রগতিশীল শ্রেণি কথায় স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও মুক্তচিন্তার কথা বললেও কাজে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে। ফলে লিবারেল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক দূরত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের স্বার্থে তাই প্রয়োজন লিবারেলদের আত্মসমালোচনামূলক পুনর্মূল্যায়ন। বাম-প্রগতিশীলদের উচিত ভণ্ডামি ও পক্ষপাত স্বীকার করে রাজনীতি, বক্তব্য ও কার্যক্রমে সামঞ্জস্য আনা। নাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে তারা আরও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে তাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে যাবে।

BD/AN

শেয়ার করুনঃ
Advertisement