ইফতারের পর এক কাপ চা—অনেকের কাছেই যেন অবিচ্ছেদ্য এক অভ্যাস। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের খাবার শেষ করে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা না হলে যেন তৃপ্তিই আসে না।
কারও পছন্দ লাল চা, আবার কারও চাই দুধ চা। অনেকেই মনে করেন, ইফতারের পরের সেই এক কাপ চা-ই এনে দেয় প্রশান্তি ও স্বস্তি।
তবে ইফতারের পর চা পান করা যদি আপনার দৈনন্দিন অভ্যাসই হয়ে থাকে, তাহলে এর উপকারিতা ও সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। কারণ ভুল সময়ে বা অতিরিক্ত চা পান করলে রোজার সময় শরীরে পানিশূন্যতা বা হজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সচেতনভাবে চা নির্বাচন ও পান করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ইফতারের পর আরামদায়ক হারবাল ইনফিউশন
ইফতারে ভারী ও তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর হজমে সহায়তা এবং স্নায়ুকে শান্ত রাখতে ক্যাফেইনমুক্ত ভেষজ চা বা হারবাল ইনফিউশন ভালো বিকল্প হতে পারে। এসব চায়ে আপনি গোলাপের পাপড়ি, তাজা পুদিনাপাতা, দারুচিনির স্টিক কিংবা অল্প পরিমাণ জাফরান যোগ করতে পারেন। এতে শুধু স্বাদ নয়, সুগন্ধেও আসবে ভিন্নমাত্রার আভিজাত্য।
ক্যামোমাইল চা
ক্যামোমাইল চা তার স্নায়ু প্রশমিত করার গুণের জন্য সুপরিচিত। এতে হালকা আপেলের মতো সুবাস থাকে, যা মনকে শান্ত করতে সহায়ক। এতে রয়েছে প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান, যা শরীরের জন্য উপকারী। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে এবং মাসিক-পরবর্তী অস্বস্তিও কমাতে সাহায্য করে। দুশ্চিন্তা কমাতে বা ঘুমের আগে এক কাপ উষ্ণ ক্যামোমাইল চা বেশ উপযোগী।
পেপারমিন্ট চা
বদহজম, বমিভাব বা পেটে অস্বস্তি কমাতে পেপারমিন্ট চা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ভাইরাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। যাঁদের গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য এটি ভালো বিকল্প হতে পারে।
আদা চা
আদা চা অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। বমিভাব দূর করতে এটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। হজমের সমস্যায় আদা চা অনেকের কাছেই কার্যকর ঘরোয়া উপায়। ক্যানসারের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের পর বমিভাব কমাতেও এটি সহায়ক বলে বিবেচিত হয়। আলসার প্রতিরোধ ও বদহজম কমাতেও আদা চা উপকারী হতে পারে। মাসিকের ব্যথা উপশমেও এটি সহায়তা করে। সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারে ভাজাপোড়া খাবার খেলে, এরপর এক কাপ আদা চা হজমে স্বস্তি দিতে পারে।
জবা চা
জবা ফুলের চা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি এর পুষ্টিগুণও উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, নিয়মিত জবা চা পান করলে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে যাঁরা মূত্রবর্ধক ওষুধ সেবন করেন, তাঁদের এ চা পান করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
দুধ চা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে পানিকে ৯৫ থেকে ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটানো ভালো। আর গ্রিন টির জন্য প্রায় ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ, কারণ অতিরিক্ত গরম পানিতে গ্রিন টি তেতো হয়ে যেতে পারে।
চায়ের সঠিক স্বাদ ও ঘ্রাণ পেতে চা পাতা গরম পানিতে ৩ থেকে ৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখা উচিত। অতিরিক্ত চিনি ব্যবহার না করে পরিমাণ কমানো ভালো; বিকল্প হিসেবে মধু ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইফতারের পরপরই অতিরিক্ত কড়া ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান না করাই উত্তম। এতে শরীরে পানিশূন্যতা বাড়তে পারে। কড়া চা বা কফি চাইলে রাতের একটু পরে পান করাই ভালো। সচেতনভাবে চা পান করলে ইফতারের পরের সময়টা যেমন উপভোগ্য হবে, তেমনি স্বাস্থ্যও থাকবে সুরক্ষিত।
































