পদায়ন-পদোন্নতিতে অভিযোগের পর বদলি ব্যবস্থায় লটারি
Published : ১৭:৪৪, ৬ অক্টোবর ২০২৬
সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই পদ্ধতি চালু করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
৬ অক্টোবর ২০২৬ সকালে আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ঢাকা জেলার ‘এ’ ক্যাটাগরির ১৮টি সাবরেজিস্ট্রার পদের বিপরীতে ১৮ জনকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচনের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, দেশের বিভিন্ন জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত সাবরেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে ঢাকা জেলার নির্ধারিত পদগুলোতে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জনসাধারণের সম্পত্তি নিবন্ধন-সংক্রান্ত সেবা আরও সহজ, সুশৃঙ্খল ও হয়রানিমুক্ত করার পাশাপাশি সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোর প্রশাসনিক সংস্কার ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বদলি-পদায়নে দীর্ঘদিনের অভিযোগ
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সাবরেজিস্ট্রারের পদও এসব অভিযোগের বাইরে নয়।
অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে সুবিধাজনক কিছু এলাকায় পদায়ন পেতে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অনৈতিক প্রভাব বা আর্থিক লেনদেনের আশ্রয় নেন। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য ব্যয় করা অর্থ পরবর্তী সময়ে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ সেবাগ্রহীতার ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ শুধু সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পছন্দের কর্মস্থল, গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক এলাকায় পদায়নকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো পদ ও কর্মস্থলকে ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও গণমাধ্যমে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগেও প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের পদায়ন নিয়েও অতীতে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকার থানায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—কোনো কর্মকর্তা যদি দায়িত্ব পাওয়ার জন্য অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তৈরি হলে তা বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জনসাধারণের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশাসনে পদায়ন নিয়ে বিতর্ক
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতিকে ঘিরে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ নিয়ে নানা আলোচনা তখন প্রকাশ্যে আসে।
এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো পুরোপুরি দূর হয়ে যায়নি—এমন ধারণা তৈরি হয়।
বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
চিকিৎসকদের বদলি নিয়েও অভিযোগ
চিকিৎসকদের পদায়ন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকায় বদলি হতে আর্থিক লেনদেন ও তদবিরের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
এর পেছনে দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অতিরিক্ত ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়াকেও একটি কারণ হিসেবে দেখা হয়। ফলে রাজধানীতে কর্মরত থাকার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় এবং কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে বদলি হতে তদবিরের প্রবণতা বাড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ব্যাপক বদলিও আলোচনায় আসে। তিন হাজার মেডিক্যাল অফিসার ও ৫০০ কর্মচারীর বদলির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। বদলি হওয়া কিছু চিকিৎসক নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি—এমন অভিযোগও ওঠে। এতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।
অতিরিক্ত ঢাকাকেন্দ্রিকতার প্রভাব
সরকারি চাকরিতে কর্মরতদের একটি বড় অংশ রাজধানীতে থাকতে চান—এটি বাস্তবতা। কিন্তু দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক ও পেশাগত জনবলকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়।
চিকিৎসা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ঢাকাকেন্দ্রিকতার প্রভাব রয়েছে। বদলি ও পদায়নের বর্তমান ব্যবস্থাও এই প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
লটারি পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে
এই বাস্তবতায় সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি একটি নতুন প্রশাসনিক পদ্ধতি হিসেবে সামনে এসেছে। এর মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তা কোন কর্মস্থলে যাবেন, সেই সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত প্রভাব, তদবির বা অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
যোগ্য কর্মকর্তাদের নির্ধারিত তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণ করা হলে বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থল পাওয়ার জন্য অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও কমতে পারে।
তবে শুধু লটারি চালু করলেই বদলি ও পদায়নে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। লটারির পাশাপাশি কর্মকর্তার যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা, কর্মস্থলের প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলোও নীতিমালার আওতায় রাখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে লটারির প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তিনির্ভর, প্রকাশ্য ও নিরীক্ষাযোগ্য হলে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে।
অন্য ক্ষেত্রেও প্রয়োগের সুযোগ
সাবরেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কার্যকর হলে অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে একই ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বের ধরন ও প্রশাসনিক প্রয়োজন আলাদা হওয়ায় একই পদ্ধতি সরাসরি প্রয়োগের আগে পৃথক নীতিমালা ও মানদণ্ড নির্ধারণ প্রয়োজন হবে। জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়নে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর সুযোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
একজন কর্মকর্তা যদি তদবির বা আর্থিক লেনদেন ছাড়াই কোনো পদে দায়িত্ব পান, তাহলে তাঁর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জবাবদিহির একটি পরিষ্কার কাঠামো তৈরি করা সহজ হয়। এতে পদ পাওয়ার বিনিময়ে ব্যয় করা অর্থ তুলে নেওয়ার মতো অনৈতিক প্রণোদনাও কমতে পারে।
কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা হতে পারে
সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে শুধু একটি বদলি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সরকারি প্রশাসনে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর। লটারি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বদলি-পদায়নের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা, ডিজিটাল রেকর্ড, নির্দিষ্ট মেয়াদ, জবাবদিহি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারির এই উদ্যোগ তাই সরকারি চাকরিতে বদলি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। উদ্যোগটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এবং এর ফল নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানেও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর বদলি ব্যবস্থার পথ তৈরি হতে পারে।






























