চার দিন বন্দিদশার পর টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ব্যবসায়ী উদ্ধার

চার দিন বন্দিদশার পর টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ব্যবসায়ী উদ্ধার হত্যার ভয় নিয়ে বন্দি চার দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে উদ্ধার

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১২:২৯, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

‘আল্লাহ আমাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশকে অনেক ধন্যবাদ। বাংলাদেশের মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা রাখা উচিত।’ চার দিনের বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান।

চোখ ও হাত বেঁধে আটকে রাখা হয়েছিল তাঁকে। হত্যার ভয়, নির্যাতন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটে চারটি দিন। অবশেষে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অভিযানে কক্সবাজারের টেকনাফে লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে জীবিত উদ্ধার হন তিনি। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুঁইছড়ি প্রেমবাজারে নিজের হার্ডওয়্যারের দোকান মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজে বসে ছিলেন হাসান। এ সময় কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা কটি পরা, মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপধারী চার-পাঁচজন ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করে। নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দিয়ে তারা হাসানকে হ্যান্ডকাফ পরায়, মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে জোর করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয়।

পরে একের পর এক যানবাহন বদলে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, অপহরণকারীরা তাঁকে বিভিন্ন বাড়িতে আটকে রেখে হাত ও চোখ বেঁধে রাখে। অস্ত্র দেখিয়ে হত্যার ভয় দেখানো হতো। পরিবারের সঙ্গে কথা বলানোর সময়ও তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। মুখে স্কচটেপ লাগানো থাকায় ঠিকমতো কথা বলার সুযোগও পাননি তিনি।

এদিকে, অপহরণের পর হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

যেভাবে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান
ঘটনার খবর পাওয়ার পর চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের নির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান এবং ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়।

পুলিশ সুপার জানান, মুক্তিপণের জন্য ব্যবহৃত ফোন নম্বরগুলো ভুয়া ও ভিআইপি নম্বর হওয়ায় সেগুলোর সূত্র ধরে অপহরণকারীদের শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এ অবস্থায় সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয়দের তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় করে অপহরণকারীদের চলাচলের পথ অনুসন্ধান করা হয়।

মাসুদ আলম বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বাঁশখালী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অপহরণকারীদের চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়। তারা প্রথমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং পরে একটি মাইক্রোবাসে করে ভুক্তভোগীকে নিয়ে যায়।

এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর এলাকার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সিও রয়েছেন। তাঁকে এ চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার, ‘এসআরবি’ লেখা পাঁচটি কালো কটি, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কৌশলে উদ্ধার
ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, হাসানকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় আটকে রাখা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালালে ভুক্তভোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারত। এ কারণে বিকল্প কৌশল নেওয়া হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দিয়েই ক্যাম্পে থাকা অপহরণকারীদের ফোন করানো হয়। তাদের জানানো হয়, মুক্তিপণের টাকা পাওয়া গেছে এবং হাসানকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এরপর তাঁকে ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে আসতে বলা হয়।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালানো ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই কৌশল অবলম্বন করা হয়। সুমন মুন্সির ফোন পেয়ে অপহরণকারীরা হাসানকে বাইরে নিয়ে এলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।

২১ অক্টোবর ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে এ অভিযান চালানো হয়। উদ্ধারের সময় হাসানের চোখ ও হাত বাঁধা ছিল। পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, অপহরণের পর থেকে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তাঁর চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং প্রায় চার দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়েছিল।

চার দিনের বন্দিদশা শেষে জীবিত ফিরে আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন হাসান। অন্যদিকে, অপহরণে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement