জাপানের অর্থনীতি: ব্যয় ও রাজস্বের ভারসাম্যে চাপে তাকাইচি
Published : ১৯:০২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন, তাঁর সরকার বেপরোয়া ব্যয়ের পথে হাঁটছে না। তবে এবার রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিনিয়োগ, ভোগ্যপণ্যের কর কমানো এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের বাজেট পরিকল্পনাই নির্ধারণ করবে বাজারের আস্থা কতটা অর্জন করতে পারবেন তাকাইচি।
মিজুহো ব্যাংকের অধীন মিজুহো রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাইসুকে সাকাই বলেন, এখন থেকে সরকারের আসল পরীক্ষা হবে কথার বদলে কাজে। তাঁর মতে, বাজেটের মাধ্যমে বাজারকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রবৃদ্ধিমুখী বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
গত বছরের ২১ অক্টোবর জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকাইচি প্রবৃদ্ধিমুখী রাজস্বনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে জাপান সরকার যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে না। তাই সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে চান তিনি।
জাপান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ তোমোহিসা ইশিকাওয়ার মতে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নির্দিষ্ট মাত্রায় সক্রিয় রাজস্ব ব্যয়ের মাধ্যমে শিল্পনীতিকে এগিয়ে নেওয়া বর্তমান বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এই কৌশল বাস্তবায়নে অর্থের জোগান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এপ্রিলে শুরু হতে যাওয়া দুই বছর মেয়াদি একটি উদ্যোগের আওতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ওপর ভোগ কর ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হবে। এতে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেছেন, বাজারের আস্থা ধরে রাখতে ঘাটতি অর্থায়নের বন্ড ইস্যু না করেই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। তবে বিশ্লেষকদের উদ্বেগ, কর কমানোর সুফল ভোক্তারা আদৌ পাবেন কি না এবং দুই বছর পর সরকার করের হার আবার বাড়াতে পারবে কি না। ইশিকাওয়া বলেন, শুধু ভোগ কর কমালেই পণ্যের দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
বর্তমানে জাপান সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করছে। বাজেটের খসড়া ডিসেম্বরে প্রকাশিত হতে পারে। গত মাসে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার বাজেট চাহিদা রেকর্ড ১৪৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ২০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ইয়েন বেশি। আলাদা সম্পূরক বাজেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাথমিক বাজেটেই বেশি ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তাকাইচি জাপানের ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত ধীরে ধীরে কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সর্বোচ্চ। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই অনুপাত ছিল ২২০ শতাংশ; চলতি বছর তা আনুমানিক ২০৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে কর আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমে আসায় এ ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা হয়েছে।
সাকাইয়ের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে কর আয় বাড়া এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমে আসার ফলে রাজস্বসংক্রান্ত ঝুঁকি বাজারের প্রাথমিক আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে ইশিকাওয়া মনে করেন, জাপানের রাজস্ব পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে সরকার এখনো বাজারকে যথেষ্ট আশ্বস্ত করতে পারেনি। তাঁর মতে, কর আয় বৃদ্ধির প্রবণতা সাময়িক হতে পারে। অন্যদিকে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়তে থাকায় দেশটির রাজস্ব পরিস্থিতি এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
তাকাইচির রাজস্বনীতি নিয়ে বাজারের সতর্কতার আরেকটি কারণ হলো, তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে শিথিল রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমর্থক হিসেবে দেখা হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময়মূল্য ছিল ১৫০-এর নিচে। পরে জুলাইয়ে তা দুর্বল হয়ে প্রায় ১৬৪ ইয়েনে পৌঁছায়। একই সময়ে জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হারও বেড়েছে। এক বছর আগে হারটি ছিল প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ; সম্প্রতি তা ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা ১৯৯৬ সালের পর সর্বোচ্চ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাইয়ে ইয়েনের দর ধরে রাখতে জাপানকে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইয়েনের আরও দরপতন ঠেকাতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি জাপানকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের নামে পরিচিত ‘অ্যাবেনোমিকস’ নীতি থেকে সরে আসারও পরামর্শ দেন। ওই নীতিতে ব্যাপক মুদ্রানীতি শিথিলকরণ, নমনীয় রাজস্ব ব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শিনজো আবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং অতীতের বক্তব্যের কারণে তাকাইচিকেও প্রায়ই ওই অর্থনৈতিক নীতির সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তাঁর সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, অতীতের কিছু মন্তব্য সত্ত্বেও তাকাইচি মূল্যস্ফীতি বাড়াতে শিথিল রাজস্ব ও মুদ্রানীতির পক্ষে নন। তাঁদের মতে, জাপানের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের নীতি আর আগের মতো কার্যকর হবে না।
সূত্র: জাপান টাইমস































