সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি

Published : ১৬:৩৭, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

 সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা এবং তাঁদের অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত সাজা কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনকে অবহিত না করার ঘটনায় সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা, কনস্যুলার সহায়তা এবং আগাম তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলায় নিহত বাংলাদেশি শ্রমিক মো. শাহেদ আহমেদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে মরদেহবাহী উড়োজাহাজটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করেন। 
শাহেদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ। তবে একই সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাংলাদেশির পরিস্থিতি এবং সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা প্রবাসীদের সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। শাহেদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে বিনা মূল্যে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিবারটি ৫০ হাজার টাকার বিশেষ অনুদান পেয়েছে।
তবে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় পরিস্থিতি ভিন্ন। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নাজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাজা কার্যকরের আগে মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। 
ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সরকার দুই বাংলাদেশির মামলার রায়ের অনুলিপি, অভিযোগের বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য জানতে চেয়েছে। এসব তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নির্ধারণের কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তবে জনস্বার্থে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানা গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা, বিচার ও সাজা সম্পর্কে বাংলাদেশ মিশন কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না, তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়ার সুযোগ ছিল কি না এবং সম্ভাব্য দণ্ড লাঘবের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সরকার আগে থেকে অবহিত ছিল না। ফলে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এবং বিচারসংক্রান্ত নথি হাতে পাওয়ার আগে দূতাবাস বা মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দিষ্ট ব্যর্থতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় কনস্যুলার সহায়তার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করাও জরুরি।
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। তবে তাঁদের সবাই একই ধরনের মামলায় আটক নন। তাঁদের মধ্যে কতজন বিচারাধীন, কতজন সাজাপ্রাপ্ত, কতজন গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত এবং কতজনের ক্ষেত্রে দেশে প্রত্যাবাসন বা দণ্ড লাঘবের সুযোগ রয়েছে—এমন বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। 
বিদেশে আটক নাগরিকদের সুরক্ষায় দূতাবাসের দায়িত্ব শুধু কারাগারে বন্দিদের তালিকা সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযোজ্য আইন ও কনস্যুলার ব্যবস্থার আওতায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবারের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, আইনজীবী পাওয়ার বিষয়ে সহায়তা এবং মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব সহায়তার ধরন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, বন্দির সম্মতি, মামলার প্রকৃতি এবং দূতাবাসের এখতিয়ারের ওপর।
মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজার ক্ষেত্রে সময়মতো তথ্য পাওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, আইনজীবীর সহায়তার সুযোগ খোঁজা, পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ক্ষমা বা দণ্ড লাঘবের আবেদন করার সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো দেশের বিচারব্যবস্থায় বাংলাদেশ সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে না পারলেও নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক ও কনস্যুলার সহায়তা দিতে পারে।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় তাঁদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য বড় দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রবাসী কর্মীদের গন্তব্য দেশের আইন, সামাজিক রীতিনীতি ও বিধিবিধান সম্পর্কে আগাম সচেতন করাও জরুরি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিদেশে কর্মসংস্থানে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে জানার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, দালালদের কারণে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার রক্ষা—এই বিষয়গুলোও প্রবাসী সুরক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শাহেদ আহমেদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা সংকটের সময় প্রবাসী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড এবং হাজারো বাংলাদেশির কারাবন্দি থাকার তথ্য আরও কার্যকর কনস্যুলার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
এখন প্রয়োজন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থার মূল্যায়ন। পাশাপাশি নিয়মিত কারাগার পরিদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ মামলাগুলো দ্রুত শনাক্ত করা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনে দণ্ড লাঘবের আবেদন করার সক্ষমতা জোরদার করা দরকার।
বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আগাম তথ্য সংগ্রহ, কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, নিয়মিত কনস্যুলার সহায়তা এবং ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি। এসব ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার স্বচ্ছ মূল্যায়নই প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement