বদলি বাণিজ্য বন্ধে লটারিই হতে পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অস্ত্র
Published : ১৬:২৯, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন যদি যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের পরিবর্তে অর্থের লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত তদবিরের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, তাহলে প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতার যেসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত, সেগুলো মোকাবিলায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত পূরণকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে লটারি পদ্ধতি চালু করা দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রশাসনে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারি পদে নিয়োগ, পছন্দের কর্মস্থল পাওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়নের ক্ষেত্রে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে কোনো সরকারি পদকে যদি আর্থিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রশাসনিক সততা, জনসেবার মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই ব্যবস্থার একটি উদ্বেগজনক দিক হলো, কোনো কর্মকর্তা যদি অবৈধভাবে অর্থ ব্যয় করে লাভজনক পদে নিয়োগ বা বদলি পাওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এভাবে ঘুষের বিনিময়ে পদায়ন, পদে বসে অবৈধ সুবিধা আদায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অর্থের লেনদেনের একটি চক্র গড়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সৎ কর্মকর্তাদের কর্মপরিবেশ, সরকারি সেবার মান এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের ওপর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান কার্যকর করতে হলে শুধু দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণই যথেষ্ট নয়; অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে এমন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও দূর করতে হবে।
এ প্রেক্ষাপটে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভূমি নিবন্ধন খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের পদে বদলির সিদ্ধান্ত যদি নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন বিবেচনার পর স্বচ্ছ লটারির মাধ্যমে নেওয়া হয়, তাহলে ব্যক্তিগত তদবির ও অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমতে পারে।
গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাব-রেজিস্ট্রার পদে পদায়নকে কেন্দ্র করে অতীতে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও আলোচিত হয়েছে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তথ্য, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
তবে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি চালু করলেই সরকারি প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে বদলি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। সরকারি ব্যাংক, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ, প্রশাসন, প্রকৌশল বিভাগ এবং উন্নয়ন ও অবকাঠামোসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়ন নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অভিযোগের ধরন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও পদের প্রকৃতি অনুযায়ী পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষেত্রেও পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। কারণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নিয়োগ ও পদায়ন যদি অনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়, তাহলে তাঁদের দায়িত্ব পালনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নির্ধারিত যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড এবং জননিরাপত্তার প্রয়োজন বিবেচনায় পদায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
বিচার বিভাগ, সরকারি ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ, জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার ক্ষেত্রেও নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। এসব প্রতিষ্ঠানে পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো পদ্ধতি গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক অবস্থান, আইনগত বিধান এবং বিশেষায়িত দায়িত্ব বিবেচনায় নিতে হবে।
চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ নীতিমালা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। রাজধানী ও বড় শহরে কর্মস্থল পাওয়ার আগ্রহ, পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কারণে বদলি নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ থাকলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই চিকিৎসকদের পদায়নে জনসংখ্যা, রোগীর চাপ, চিকিৎসকসংকট, পেশাগত দক্ষতা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বিবেচনা করা উচিত। সমযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মস্থল বণ্টনের ক্ষেত্রে লটারি একটি সহায়ক পদ্ধতি হতে পারে।
একইভাবে গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বন বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানে পদায়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দায়িত্বের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয়, ঠিকাদারি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পদায়নে অনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকলে তা প্রশাসনিক দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতা যাচাই, দায়িত্বের সঙ্গে দক্ষতার সামঞ্জস্য এবং নিয়মিত নিরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।
লটারি পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুবিধা হলো, এটি নির্দিষ্ট শর্তে যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মস্থল বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ, তদবির ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমাতে পারে। তবে লটারি যেন কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত না হয়, সে জন্য এর প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য করতে হবে।
প্রথমে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, চাকরির মেয়াদ, কর্মদক্ষতা ও শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ডের ভিত্তিতে যোগ্য কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর সমযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে যেসব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ দেওয়া যুক্তিসংগত, সেখানে স্বচ্ছ লটারি পদ্ধতিতে পদায়ন করা যেতে পারে। লটারির ফলাফল, অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের তালিকা এবং প্রক্রিয়ার নথি সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে তা যাচাই করা যায়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে লটারির বাইরে পদায়নের প্রয়োজন হলে তার যৌক্তিকতা লিখিতভাবে উল্লেখ করা উচিত। একই সঙ্গে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে লটারির আড়ালে নতুন করে অনিয়মের সুযোগ তৈরি না হয়।
তবে সব পদে লটারি উপযুক্ত সমাধান নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিশেষায়িত প্রকৌশলী, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক কিংবা উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসারে পদায়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। লটারি প্রয়োগ করা যেতে পারে তখনই, যখন প্রার্থীরা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেন এবং তাঁদের মধ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যুক্তিসংগত।
বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য বন্ধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও কার্যকর হতে পারে। অনলাইন বদলি আবেদন, নির্ধারিত সময়সীমা, প্রকাশিত নীতিমালা, সিদ্ধান্তের লিখিত কারণ এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা চালু করা গেলে প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হবে। পাশাপাশি পদায়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত নিরীক্ষা করলে অনিয়মের ধরন শনাক্ত করা সহজ হবে।
প্রশাসনিক সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পদায়নের পর কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন করা। শুধু কোথায় বদলি হলেন, তা নয়; দায়িত্ব পালনে তাঁর কর্মদক্ষতা, সততা, সেবার মান এবং জনসন্তুষ্টির বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের অপব্যবহার রোধে ন্যায়সংগত তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি চাকরিতে পদায়ন কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; এটি জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। তাই কোনো কর্মকর্তা কোথায় কাজ করবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তদবির বা আর্থিক লেনদেনের পরিবর্তে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, জনসেবার প্রয়োজন এবং স্বচ্ছ নীতিমালাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে দুর্নীতির অভিযোগে ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য বন্ধ করা সেই সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতির অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে উপযুক্ত অন্যান্য খাতে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের কার্যকারিতা নির্ভর করবে এসব উদ্যোগ কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর। মধ্যস্বত্বভোগীদের অনৈতিক তৎপরতা বন্ধ, পদায়নের নীতিমালা প্রকাশ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিতে পদায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও জনস্বার্থ; অর্থ কিংবা রাজনৈতিক তদবির নয়। লটারি এককভাবে সব দুর্নীতি দূর করতে পারবে না। তবে যোগ্যতা যাচাই, স্বচ্ছতা, নিরীক্ষা ও জবাবদিহির সঙ্গে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে এটি বদলি বাণিজ্য প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।































