সিপাহি-জনতার বিপ্লব থেকে গণঅভ্যুত্থান: জিয়া পরিবারের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা
Published : ১৫:০০, ৭ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের ভূমিকা বিএনপি ও দলটির সমর্থকদের কাছে একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন থেকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতাকে তাঁরা গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা হয়। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সিপাহিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের একটি অংশও রাজপথে অংশ নেন। বিভিন্ন স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর রাজপথ। এই ঘটনাই পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ এবং দলটির সমর্থকদের কাছে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান আবারও সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ফিরে আসেন। তিনি সেনাপ্রধানের দায়িত্বে পুনর্বহাল হন এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকলেও পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল করা হয়। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী দর্শন, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের কর্মসূচি নিয়ে দলটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
রাষ্ট্র পরিচালনার সময় জিয়াউর রহমান কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন, জনশক্তি রপ্তানি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়েও তাঁর শাসনামলে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল। তাঁর সমর্থকদের মতে, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় নিহত হন জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এর মধ্য দিয়ে দেশে নতুন করে সামরিক শাসনের সূচনা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি দ্রুত দলীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সুসংহত হয়।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। সাতদলীয় জোটের নেতৃত্বে তিনি সরকারবিরোধী আন্দোলন পরিচালনা করেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। আন্দোলনের কারণে তাঁকে বিভিন্ন সময়ে আটক ও গৃহবন্দি থাকতে হয়। ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে এরশাদবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই ব্যাপক গণআন্দোলনে পরিণত হয়।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই আন্দোলনে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা ছিল। আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর সরকারের সময়ে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও নানা সংকট তৈরি হয়। ২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপি নির্বাচনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে আন্দোলন শুরু করে।
এই সময়ে বিএনপির নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন তারেক রহমান। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর তাঁকে দলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের পরবর্তী প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে বিএনপি। দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেও তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ভূমিকা রাখেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়ে আসেন।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়। বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করেও নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগও বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলেও তা দ্রুত বৈষম্যবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। আন্দোলন ঘিরে সংঘাত, প্রাণহানি এবং ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দলটির মতে, এই গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ধারাবাহিক পরিণতি। তবে ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি বৃহত্তর গণআন্দোলন, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণ ছিল।
জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোচনায় বিএনপি তিনটি সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। প্রথমত, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা বেতারে প্রচার এবং পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা। দ্বিতীয়ত, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা। তৃতীয়ত, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ঘিরে তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান।
এই তিন প্রজন্মের রাজনৈতিক ভূমিকা বিএনপির কাছে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। দলটির নেতাকর্মীদের দৃষ্টিতে, জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সূচনা, খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন একই রাজনৈতিক দর্শনের ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ইতিহাসবিদ ও গবেষকের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সিপাহিদের বিদ্রোহ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা ছিল। একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তবু বিএনপি ও দলটির সমর্থকদের কাছে ৭ নভেম্বর শুধু একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়; এটি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সূচনাপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তাঁদের দৃষ্টিতে, ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান থেকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এই নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।































