ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিরাময়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাই মূল চাবিকাঠি: বিশেষজ্ঞগণ

ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিরাময়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাই মূল চাবিকাঠি: বিশেষজ্ঞগণ প্রতীকী ছবি : বিজনেস ডেইলি

বিজনেস ডেইলি ডেক্স

Published : ১১:৩৬, ২৩ জুলাই ২০২৬

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট টিবি বা ডিআর-টিবি) এখন কার্যকরভাবে নিরাময় করা সম্ভব। তবে অজ্ঞতা, সামাজিক কুসংস্কার, চিকিৎসায় অনিয়ম এবং রোগ লুকিয়ে রাখার প্রবণতাই যক্ষ্মা নির্মূলে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, চিকিৎসা প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সামাজিক সচেতনতার অভাব এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। এদিকে ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট টিবি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সফল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

শ্বাসতন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. দেওয়ান আজমল হোসেন বলেন, ডিআর-টিবির চিকিৎসায় বাংলাদেশের সাফল্যের হার ৯০ শতাংশের বেশি। দেশে উদ্ভাবিত ও বাস্তবায়িত বিপিএএল (BPaL) ও বিপিএএলএম (BPaLM) পদ্ধতি—স্বল্পমেয়াদি সম্পূর্ণ মুখে খাওয়ার ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা—বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি জানান, ৪৬০টিরও বেশি উপজেলায় জিনএক্সপার্ট পরীক্ষার সুবিধা এবং শক্তিশালী চিকিৎসা অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সচেতনতার অভাব ও সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা নেন না বা রোগ গোপন করেন।

অধ্যাপক আজমল আরও বলেন, নিয়মিত ওষুধ সেবনের পরও যদি ক্ষুধা, শক্তি বা স্বাভাবিক সুস্থতা ফিরে না আসে, তাহলে দ্রুত ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মার পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, কফ পরীক্ষায় জীবিত জীবাণুর উপস্থিতি নিশ্চিত না করে শুধু এক্স-রের স্থায়ী দাগ দেখে যক্ষ্মার ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইডিসিএইচ) সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা (সেতু) বলেন, দুই থেকে তিন মাস নিয়মিত চিকিৎসার পরও কাশি, জ্বর, বুকে ব্যথা বা ওজন কমার মতো উপসর্গ না কমলে ডিআর-টিবির সন্দেহ করা উচিত। কয়েক মাস চিকিৎসার পরও কফ পরীক্ষায় জীবাণু পাওয়া গেলে তা প্রচলিত ওষুধের অকার্যকারিতার ইঙ্গিত দেয়।

তিনি জানান, আগে ডিআর-টিবির চিকিৎসা ১৮ থেকে ২৪ মাসের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছিল এবং প্রতিদিন ইনজেকশন নিতে হতো। বর্তমানে বেডাকুইলিন ও প্রিটোমানিডের মতো আধুনিক ওষুধের মাধ্যমে ছয় থেকে নয় মাসের সম্পূর্ণ মুখে খাওয়ার চিকিৎসায় রোগ নিরাময় সম্ভব।

তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনকে তিনি বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, সাধারণ কাশির জন্য নিজেরাই অ্যান্টিবায়োটিক খেলে জীবাণু আরও শক্তিশালী ও ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে।

আইসিডিডিআর,বি ও এনআইডিসিএইচ-এর জ্যেষ্ঠ মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মো. শিরাজুল ইসলাম (সুমন) বলেন, ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা মূলত মানুষের অসচেতনতার ফল। অসম্পূর্ণ চিকিৎসা, অনিয়মিত ওষুধ সেবন এবং নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারের কারণে জীবাণু ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, অনেক রোগী সামান্য সুস্থ বোধ করলেই ওষুধ বন্ধ করে দেন বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা ছেড়ে দেন, যা ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করে। এছাড়া প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের যাতায়াত ব্যয় ও পুষ্টিকর খাবারের খরচও চিকিৎসা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বড় বাধা।

বিশেষজ্ঞরা রোগীদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য, নিয়মিত ওষুধ সেবন, ডটস পদ্ধতি অনুসরণ এবং কাশির শিষ্টাচার—যেমন মাস্ক ব্যবহার, রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে কাশি দেওয়া ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এমন কক্ষে থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

তাদের মতে, যক্ষ্মার বিরুদ্ধে কার্যকর চিকিৎসা এখন হাতে রয়েছে। তাই রোগ নির্মূলে প্রয়োজন সামাজিক কুসংস্কার, অবহেলা ও বৈষম্য দূর করে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement