ফুটপাত ও অনলাইনের থেরাপি যন্ত্রে ঝুঁকছে মানুষ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
Published : ১১:০৩, ২০ আগস্ট ২০২৬
শরীরের ব্যথা ও পেশির অস্বস্তি কমাতে ফুটপাত, বাজার ও অনলাইন থেকে কম দামের ইলেকট্রনিক থেরাপি যন্ত্র কিনে ব্যবহার করছেন অনেক মানুষ। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালক ও বয়স্কদের মধ্যে এসব ম্যাসাজার, ইলেকট্রিক বেল্ট ও ডিজিটাল থেরাপি ডিভাইসের ব্যবহার বাড়ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এসব যন্ত্র ব্যবহারের কারণে সাময়িক স্বস্তির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ু ও মাংসপেশির ক্ষতি, টিস্যু ড্যামেজ এমনকি শরীরের ভেতরে পোড়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় এমন একটি থেরাপি মেশিন কিনতে দেখা যায় মোটরসাইকেলচালক জুয়েল রানাকে। প্রায় এক যুগ ধরে মোটরসাইকেল চালানো জুয়েল প্রতিদিন সাত ঘণ্টার বেশি সময় বাইকে থাকেন। এতে হাঁটু ও মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। সেই ব্যথা কমাতে প্রায় এক বছর ধরে ফুটপাত থেকে কেনা ম্যাসাজার ব্যবহার করছেন তিনি।
জুয়েল বলেন, দীর্ঘক্ষণ বাইক চালানোর পর রাতে হাঁটুর মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা ও জ্বালাপোড়া হয়। থেরাপি মেশিন ব্যবহারে সাময়িক আরাম পাওয়া যায়। আগের যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ৯৫০ টাকায় নতুন একটি কিনছেন তিনি। তবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সময় পান না বলে জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যথার কারণ নির্ণয় না করে শুধু যন্ত্রের মাধ্যমে উপশমের চেষ্টা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ঘাড়, পিঠ, কোমর বা হাঁটুর ব্যথার কারণ ভিন্ন হতে পারে। ফলে কোন রোগীর জন্য কোন ধরনের ইলেকট্রোথেরাপি, কতটা তীব্রতায় এবং কতক্ষণ ব্যবহার করতে হবে—তা চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে নির্ধারণ করা জরুরি।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. তছলিম উদ্দিন বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অননুমোদিত যন্ত্র দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বাজার ও অনলাইনে পাওয়া অনেক ডিভাইসের কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ব্যবহারকারীরা সঠিক তথ্য পান না।
১২৪ কোটি টাকার বাজার
গ্লোবাল মার্কেট রিসার্চ প্রতিষ্ঠান 6Wresearch-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি ইকুইপমেন্টের বাজারের আকার প্রায় ১২৪ কোটি টাকা। বাজারটি বছরে প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০৩২ সালের মধ্যে এ বাজার প্রায় ১৮০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার কয়েকটি মার্কেটে বেশি বিক্রি
রাজধানীর চকবাজারের বিসমিল্লাহ মার্কেট, স্টেডিয়াম মার্কেট, বিএমএ ভবন ও মোতালেব প্লাজায় এসব থেরাপি সরঞ্জামের উল্লেখযোগ্য বেচাকেনা হয়। এর বড় অংশ চীন, ভারত ও তাইওয়ান থেকে আমদানি করা হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
তোপখানা রোডের মক্কা সার্জিক্যাল মার্কেটের ব্যবসায়ী মাজহারুল ইসলাম জানান, গত তিন-চার বছরে এসব পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে ব্যবহার বেশি। আগে মাসে ১০-১৫টি যন্ত্র বিক্রি হলেও এখন ৫০টির বেশি বিক্রি হচ্ছে। পণ্যের দাম ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। তার দাবি, সরাসরি মার্কেটের তুলনায় অনলাইনে এসব পণ্যের বিক্রি আরও বেশি।
বিএমএ মার্কেটের ব্যবসায়ী ও বিএমএ ভবন শপ ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক মো. ইলিয়াস সরকার বলেন, চাহিদা বাড়ার সঙ্গে নিম্নমানের ও ভেজাল যন্ত্রের সংখ্যাও বেড়েছে।
ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন না ক্রেতারা
অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে মায়ের পেটের চর্বি কমানোর জন্য ইলেকট্রিক ম্যাসাজ বেল্ট কিনতে এসেছিলেন বিপ্লব হাসান। তিনি জানান, বিজ্ঞাপনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়নি এবং তিনি চিকিৎসকের পরামর্শও নেননি।
একই মার্কেটের ব্যবসায়ী এবাদাত হোসেন বলেন, প্রতিটি ইলেকট্রিক থেরাপি যন্ত্র সঠিক মাত্রা ও নিয়ম মেনে ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিন্তু কোন ব্যক্তির জন্য কী মাত্রা উপযোগী, তা অনেক বিক্রেতাই জানেন না। দীর্ঘদিন ভুলভাবে ব্যবহার করলে মাংসপেশিতে জ্বালাপোড়া বা ক্ষত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চটকদার বিজ্ঞাপনে বাড়ছে চাহিদা
ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত অভিনয়শিল্পী বা জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ব্যবহার করে পণ্যটির কার্যকারিতা সম্পর্কে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
শ্যামলী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের ফিজিওথেরাপিস্ট ফজলুল হক বলেন, নির্দিষ্ট মাত্রা, ফ্রিকোয়েন্সি ও তীব্রতা না মেনে ইলেকট্রোথেরাপি ব্যবহার করলে স্নায়ু ও মাংসপেশির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিফ ফিজিওথেরাপিস্ট ও বাংলাদেশ সরকারি চাকরিজীবী ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শফিকুল ইসলাম অপু বলেন, রাস্তাঘাট ও অনলাইনে বিক্রি হওয়া অনেক যন্ত্রের যথাযথ সার্টিফিকেশন নেই। অননুমোদিত ডিভাইসের ফ্রিকোয়েন্সি সঠিক না হলে টিস্যু ড্যামেজ, নার্ভ ইনজুরি এবং শরীরের ভেতরে বার্ন হওয়ার মতো গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সল বলেন, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসাসংক্রান্ত পণ্যের প্রচার ও বিক্রি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের ব্যাপক প্রচারের কারণে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যথা কমানোর জন্য ফুটপাত বা অনলাইন থেকে যেকোনো থেরাপি যন্ত্র কেনার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি পণ্যের অনুমোদন, মান ও ব্যবহারের নির্দেশনা যাচাই না করে এসব ডিভাইস ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।



































