তারেক রহমানের ভারত সফর না যাওয়ার ঘোষণার পরই আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয়, উঠছে প্রশ্ন

তারেক রহমানের ভারত সফর না যাওয়ার ঘোষণার পরই আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয়, উঠছে প্রশ্ন ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১২:২৭, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণা এবং এর পরদিন ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সময়ে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—ঘটনাগুলো নিছক কারিগরি ও জ্বালানি সংকটের ধারাবাহিকতা, নাকি এর সঙ্গে ঢাকা-দিল্লির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কোনো সম্পর্ক রয়েছে?

তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে।

সফর বাতিলের পরদিনই ইউনিট বন্ধ
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ নিতে ভারত যাচ্ছেন না।

ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে তার প্রথম ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এর পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে।

একই সময়ে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্য সামনে আসে।

আদানির ব্যাখ্যা কারিগরি ত্রুটি ও কয়লা সংকট
আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে অবশ্য রাজনৈতিক কোনো কারণের কথা বলা হয়নি। কোম্পানিটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভারতের রেলপথে অতিরিক্ত চাপ, বিভিন্ন স্থানে লোডিং বিধিনিষেধ এবং কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছিল।

২ সেপ্টেম্বর আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, তারা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি অবহিত করেছে এবং ভারতীয় রেলের সঙ্গে সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।

এর কয়েক দিন পর উৎপাদন বাড়তে শুরু করলেও একটি ইউনিট বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বয়লারের একটি অংশে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ইউনিটটি বন্ধ করতে হয় এবং মেরামতের আগে সেটিকে ঠান্ডা করতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।

অর্থাৎ আদানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে প্রথমে ছিল কয়লা পরিবহন সমস্যা এবং পরে কারিগরি ত্রুটি।

২০১৭ সালের চুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি দায়
আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট।

এটি আগের সরকারের সময়ে করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি। বর্তমান সরকার সেই চুক্তির আওতায় বিদ্যুৎ কিনছে।

ফলে বর্তমান সংকটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—চুক্তিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে কী ধরনের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে।

চুক্তির সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ চুক্তিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে কী ধরনের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বিবেচনা বা অন্যান্য প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তা নির্ভর করে চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তের ওপর।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এর আগে আদানি চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাদের মতে, চুক্তিতে গুরুতর অসাম্য বা চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয় থাকলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন কমার কারণ নয়, চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের সুরক্ষা রাখা হয়েছে—সেটিও সামনে এসেছে।

রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে মিলেই যত প্রশ্ন
আগস্ট থেকে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সফরের আগে ‘অনুকূল পরিবেশের’ প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

৫ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানিয়েছিলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই এবং সফরের তারিখও চূড়ান্ত হয়নি।

এরপর ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশ নিতে ভারত যাচ্ছেন না। আর এর পরদিনই সামনে আসে গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর।

এই সময়গত নৈকট্য থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে সময়ের মিল থাকা আর একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটির সরাসরি যোগসূত্র প্রমাণ হওয়া এক বিষয় নয়।

বিদ্যুৎ সংকট শুধু আদানির কারণে নয়
দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে শুধু আদানি পাওয়ারের উৎপাদন কমে যাওয়াকে দায়ী করা যায় না। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে দেশের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।

ফলে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।

১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, আদানির কেন্দ্রটি আগের রাতে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করলেও একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে নতুন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাব এনাম খান সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে সরলভাবে ‘ভারতবিরোধী’ হিসেবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও জনগণের যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশ নিজের সার্বভৌম ও আইনগত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে।

দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন এফ. ড্যানিলোউইচও অর্থবহ আলোচ্যসূচি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বিশেষজ্ঞদের এসব বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা আগের তুলনায় ভিন্ন এবং দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।

বিদ্যুৎ কি কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—বিদ্যুৎ সরবরাহ কি কখনো কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হতে পারে?

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ ধরনের প্রশ্নের গুরুত্ব রয়েছে। একটি আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরবরাহ ব্যবস্থায় কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে বর্তমান ঘটনায় রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এমন অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সামনে যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
বর্তমান পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে আদানি পাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কয়েকটি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। গোড্ডা কেন্দ্রের ইউনিটে ঠিক কী ধরনের কারিগরি ত্রুটি হয়েছে, মেরামতে কত সময় লাগবে, কয়লা সরবরাহের সমস্যা কতটা গুরুতর এবং চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের কী ধরনের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করা প্রয়োজন, আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিলে বিকল্প উৎস থেকে ঘাটতি পূরণের কী ব্যবস্থা রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

সময়ের মিল প্রমাণ নয়, তবে তদন্ত জরুরি
তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণা এবং পরদিন আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার ঘটনা—দুটি ঘটনাই পরপর ঘটেছে। এটিই বর্তমান আলোচনার মূল কারণ।

কিন্তু শুধু সময়ের মিলের ভিত্তিতে রাজনৈতিক যোগসূত্রের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বিষয়টি পরিষ্কার করতে প্রয়োজন চুক্তির শর্ত, উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্য, কারিগরি ত্রুটির নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য।

যদি এটি নিছক কারিগরি ও জ্বালানি সংকট হয়, তাহলে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করাই হবে প্রধান দায়িত্ব। আর যদি ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের জন্য গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা ও চুক্তিগত দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে রাজনৈতিক টানাপোড়েন থেকে দূরে রাখাই দুই দেশের জন্য অধিকতর নিরাপদ।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement