ভারতে নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে যারা

ভারতে নানকের কাছে মাসে যায় কোটি টাকা, নেপথ্যে যারা ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৫:৩৮, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের কাছে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। বরিশাল ও ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, বাড়ি ও সম্পত্তি থেকে আসা আয়ের একটি অংশ দুই হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং বেনাপোলের একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি নানকের তিন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি দেখভাল করছেন বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন নানক। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। ওই দিন তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতের শিলংয়ে প্রবেশ করেন। পরে মালদা হয়ে কলকাতায় যান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানকের দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেন তার মেয়ে রাখির স্বামী চিকিৎসক নাজমুল। তবে সাক্ষাৎকারে যে তথ্য তিনি জানাননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তা হলো—কলকাতার তপসিয়া এলাকায় আগে থেকেই একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কলকাতায় পৌঁছে স্ত্রীকে নিয়ে সেখানেই ওঠেন নানক। বর্তমানে তাদের ওই এলাকায় এবং কলকাতার বিভিন্ন অভিজাত শপিংমলে দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটির দাবি, বিদেশে অবস্থান করেও নানক ও তার স্ত্রী বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন এবং এর অর্থের জোগান বাংলাদেশ থেকেই যাচ্ছে। বরিশাল ও ঢাকা থেকে প্রতি মাসে বড় অঙ্কের টাকা অবৈধ হুন্ডি ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে বলে এতে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ প্রক্রিয়ায় নানকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসরের পর তিনি নানকের মালিকানাধীন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন। ৫ আগস্টের পর আন্দোলনের মুখে ওই চাকরি ছাড়লেও নানকের কাছ থেকে আগে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া ষাটোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি এখনও অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বরিশাল নগরীর সদর রোড ও কাঠপট্টি এলাকার দুই হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সরাসরি ভারতে টাকা পাঠানো হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের একজন হোটেল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, আর অন্যজন স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

নানকের মালিকানাধীন বিভিন্ন ভবন ও সম্পত্তি থেকে আদায় করা ভাড়ার অর্থ ওই দুই ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে তারা পশ্চিমবঙ্গে রুপিতে নানকের কাছে অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ঢাকায় থাকা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় এবং তিনটি বাড়িসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে আসা অর্থও একইভাবে ভারতে পাঠানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেনাপোল সীমান্ত এলাকার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের মালিককে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ঢাকা থেকে যশোরে ওই ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর পর পশ্চিমবঙ্গে থাকা তার এজেন্টের মাধ্যমে নানকের কাছে রুপি পৌঁছে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার আয় পশ্চিমবঙ্গে পাঠানোর বিষয়টি নানকের এক ছোট ভাই দেখভাল করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে নানকের সম্পদ বৃদ্ধির হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় নিজের ও স্ত্রীর নামে মোট ৬৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের হলফনামায় সেই সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৯ কোটি টাকা দেখানো হয়। অর্থাৎ ১৬ বছরের ব্যবধানে ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ গুণ বেড়েছে। তবে বাস্তবে নানক পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি এবং তা শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় নানক দম্পতির মালিকানাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর তথ্য নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়-ব্যয়ের হিসাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।

বরিশালের দোয়ারিকা সেতু এলাকায় প্রায় ৮ একর জমির মালিকানার তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনী হলফনামায় বরিশাল নগরীতে দুটি বাড়ি, মাছের খামারসহ ২ একর ২২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ থাকলেও এসব সম্পত্তিতে থাকা বিভিন্ন ভবন এবং সেখান থেকে পাওয়া ভাড়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর বাইরে ঢাকার কলাবাগান, কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় নানক পরিবারের নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনী হলফনামায় বরিশালে দুটি বাড়ির পাশাপাশি রাজধানীর উত্তরায় ছয়তলা এবং মোহাম্মদপুরে আটতলা বাড়ির তথ্য উল্লেখ করেছিলেন নানক। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও এসব সম্পত্তিতে কোনো বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। বরিশালের বটতলা এলাকার বাড়িগুলো থেকেও নিয়মিত ভাড়া আদায় হচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বরিশালের রুপাতলী, মতাসার, সার্কুলার রোড ও করিম কুটিরসহ বিভিন্ন এলাকায় নানকের জমিতে থাকা বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা থেকেও ভাড়া আদায় হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব সম্পত্তি ও ব্যবসা থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি আয় হচ্ছে এবং সেই অর্থের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে পাঠানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে সম্প্রতি দেশে ফেরা আওয়ামী লীগের এক কর্মী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো অর্থ গ্রহণের জন্য নানককে বাইরে যেতে হয় না। নির্ধারিত এজেন্টরা তপসিয়া এলাকার ফ্ল্যাটে গিয়ে অর্থ পৌঁছে দেন বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পরও দীর্ঘ সময় ধরে এভাবেই অর্থ পৌঁছাতে দেখেছেন তিনি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিচিত বিভিন্ন ফোন ও মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তার কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সূত্র: যুগান্তর

শেয়ার করুনঃ
Advertisement