এআইয়ে বাংলাদেশের চাকরি যাবে, নাকি তৈরি হবে নতুন সুযোগ?

এআইয়ে বাংলাদেশের চাকরি যাবে, নাকি তৈরি হবে নতুন সুযোগ? ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১২:১০, ১১ আগস্ট ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার বিশ্বজুড়ে চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি করলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এর প্রভাব কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের কারণে কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হলেও কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।


‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিদ্যমান চাকরির প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এই হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরিতে এআই মানুষের কাজে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।


তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, অর্থ ও ব্যবসায়িক সেবার মতো চিন্তাশক্তিনির্ভর কাজের ক্ষেত্রে এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়তার সম্ভাবনা বেশি।

তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম।

ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষেত্রে এআইয়ের তাৎক্ষণিক প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারাবেন—এমন সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

বরং কাজের ধরন ও দক্ষতার চাহিদায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাই বেশি।


ঝুঁকিতে তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীরা
বিশ্বব্যাংক বলছে, এআইয়ের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না।

দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ ও মাঝারি দক্ষতার কর্মীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।


চ্যাটজিপিটি চালুর পর এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয় করা সহজ—এমন কিছু চাকরির চাহিদা কমেছে।

চীন ও ভারতেও জেনারেটিভ এআই চালুর পর এআই দিয়ে করা সম্ভব এমন কাজের চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে উচ্চ দক্ষতার সেবা খাতে এর প্রভাব পড়ছে এবং তরুণেরা তুলনামূলক বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।


ছোট ব্যবসায় এআইয়ের নতুন সুযোগ
উন্নয়নশীল দেশগুলোর আরেকটি বড় সুবিধা হতে পারে ছোট ব্যবসা।

নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যেখানে কর্মীসংখ্যা ১০ জনের কম।

অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেরাই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।


এআই এসব ছোট ব্যবসাকে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ব্যবসায়িক কাজে সহায়তা করতে পারে।

মেসেজিং অ্যাপ, ব্যবসায়িক সফটওয়্যার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহকসেবা, বিপণন ও দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহার করা সম্ভব।


ভারত, জর্ডান, কেনিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া ও থাইল্যান্ডের অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ব্যবসায়িক কাজে এআই চ্যাটবট ব্যবহার শুরু করেছে।


এআই ব্যবহারে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একেবারে পিছিয়ে নেই।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের স্বাস্থ্য খাতের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

এআইনির্ভর মেডিকেল ইমেজিং ব্যবহারের ফলে ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা শনাক্তের পরীক্ষা প্রতিদিন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।


দেশে সরকারি ডিজিটাল সেবার যে ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি হয়েছে, সেটি এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো সম্ভব।

কৃষি, স্বাস্থ্য ও নাগরিকসেবায় এআই ব্যবহারের উদ্যোগ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।


তবে সব ক্ষেত্রে সাফল্য আসেনি।

মোবাইল ফোনের তথ্য ব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের এআইভিত্তিক পদ্ধতি প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় যথেষ্ট নির্ভুল ফল দিতে পারেনি।

এ কারণে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ হলো, অন্য দেশের প্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহার না করে বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতায় তা যাচাই ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে।


বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষতা ও অবকাঠামো
এআইয়ের সুফল পেতে জাতীয় এআই নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কার্যকর করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি গ্রহণে নিয়ন্ত্রক ও বৈদেশিক মুদ্রাজনিত বাধা কমানো এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।


কানাডীয় অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁও বলেছেন, যেসব অর্থনীতিতে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তারা এআই থেকে তুলনামূলক বেশি লাভবান হতে পারে।

এআই দক্ষতার ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে দিয়ে দেশগুলোর মধ্যে দক্ষতার ব্যবধান কমাতে পারে।


তবে এর জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং এআই ব্যবহারের সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

পাশাপাশি প্রযুক্তি গ্রহণের খরচও কমাতে হবে।


পোশাক খাতে বড় ঝুঁকি
তবে এআই ও অটোমেশনের কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ঝুঁকি একেবারে নেই, এমন নয়।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘ইজ বাংলাদেশ রেডি ফর দ্য ফিউচার অব ওয়ার্ক’ শীর্ষক নীতিপত্রে তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।


প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অটোমেশনের কারণে তৈরি পোশাক খাতের সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি ঝুঁকিতে রয়েছে।

২০৪১ সালের মধ্যে নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।


এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এলডিসি উত্তরণ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রভাব।

২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মী।


এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ
শ্রম গবেষক ও উৎপাদন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অটোমেশন ও উচ্চ প্রযুক্তি গ্রহণ ঠেকানোর সুযোগ নেই।

বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের খাপ খাওয়ানোর প্রস্তুতি নিতে হবে।


শ্রম অধিকার ও গবেষণাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের মতে, অটোমেশনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো প্রস্তুতি ও বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার অভাব।


তিনি কর্মীদের অটোমেশনের আগেই প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্মহীনদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।


বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআই নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর সুফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না।

বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষতা, তথ্যব্যবস্থা ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।


অর্থাৎ বাংলাদেশের সামনে এআই একদিকে চাকরি হারানোর ঝুঁকি, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতা ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা—দুটিই নিয়ে এসেছে।

নিজস্ব অত্যাধুনিক এআই ব্যবস্থা তৈরির চেয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি গ্রহণ করে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিকে কাজে লাগানোই বাংলাদেশের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement