দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষায় যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এখন ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ভিসা পেতেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
ইউরোপের বহু দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে না থাকায় শিক্ষার্থীদের ভারত গিয়ে ভিসা আবেদন করতে হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে ইউরোপের এসব দেশের ভিসা পাওয়া আরও দুরূহ হয়ে পড়ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছেন, তার প্রভাব বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেও পড়েছে। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে পড়তে যেতে চাইলে আগের তুলনায় ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন বিদেশে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা।
পূর্ব ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের দূতাবাস বাংলাদেশে না থাকায় সেসব দেশের ভিসার জন্য শিক্ষার্থীদের ভারত যেতে হয়। সেখানে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করতে অন্তত তিন সপ্তাহ থাকতে হয়। কোনো কোনো দেশের ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি আরও বেশি। যেমন, মধ্য ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়ার ভিসা পেতে শিক্ষার্থীদের তিনবার পর্যন্ত ভারতে যেতে হয়, কারণ আবেদন শেষে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।
বাংলাদেশে পর্তুগাল, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, হাঙ্গেরি ও অস্ট্রিয়ার মতো ইউরোপের একাধিক দেশের দূতাবাস নেই। ফলে এসব দেশে পড়তে চাইলে শিক্ষার্থীদের ভারত গিয়ে ভিসা সাক্ষাৎকার দিতে হয়। বিকল্প হিসেবে ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম থেকে কিছু দেশের ভিসা আবেদনের সুযোগ থাকলেও সেখানকার ভিসাও এখন বাংলাদেশিদের জন্য সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
এমনকি ঢাকায় জার্মান দূতাবাস থাকা সত্ত্বেও জার্মানির স্টুডেন্ট ভিসার সাক্ষাৎকার পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রায় ২৮ মাস। ফলে জার্মানিতে পড়তে যেতে চাইলে আড়াই থেকে তিন বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিদেশে পড়াশোনায় সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান সিএসবির সিইও জুলফিকার আলী। তার মতে, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিরতি তৈরি হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে নেতিবাচক হিসেবে ধরা পড়ে এবং অনেকেই শেষ পর্যন্ত সুযোগ হারান।
ভিসা জটিলতা নিয়ে গত ৮ অক্টোবর কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ভিসা সমস্যার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জার্মানির ক্ষেত্রে তিনি বলেন, প্রতি বছর পাকিস্তান থেকে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী নিলেও বাংলাদেশ থেকে সে সংখ্যায় শিক্ষার্থী নিতে দেশটি রাজি নয়। জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা বিনা খরচে ও মানসম্মত হওয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি হলেও দূতাবাসের সক্ষমতা বছরে মাত্র দুই হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করার।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মো. শরিফুজ্জামান জানান, আংশিক স্কলারশিপ পাওয়ার পরও তার ভিসা নাকচ হয়, যা তাকে চরম হতাশায় ফেলেছে। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত অর্ধেকেরও কম যেতে পারেন।
এদিকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদন বাতিল বা স্থগিত করছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ভিসা কমপ্লায়েন্স নীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী বাছাইয়ে আরও সতর্ক হয়েছে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশ ছাড়ালেই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্পনসর লাইসেন্স ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের অন্তত নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কোথাও সরাসরি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীরা ভর্তি নিশ্চয়তাপত্র পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, ছাত্র ভিসার অপব্যবহার এবং আশ্রয়প্রার্থনার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃত শিক্ষার্থীরাও এখন বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়ছেন।



































