ট্রাম্পের ইরান নীতির সঙ্গে ভ্যান্সের প্রকাশ্য মতবিরোধ
Published : ১৪:২৪, ৫ নভেম্বর ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিরোধে জড়িয়েছেন ভ্যান্স। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্টের অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন তিনি।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ভ্যান্স রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের পেছনে ইরানের অজনপ্রিয় যুদ্ধকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে ভোটারদের প্রত্যাখ্যানের দায় থেকে নিজেকে কিছুটা আলাদা রাখার চেষ্টা করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভ্যান্স জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন। বুধবারের পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আপনি যদি যুক্তি দিতে চান যে এই যুদ্ধটি সার্থক ছিল, আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোও সার্থক ছিল, তাহলে সেই যুক্তি দিন।’
অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রচারণার সময় এবং ফলাফল প্রকাশের পরও ইরান যুদ্ধের পক্ষে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন ট্রাম্প। বুধবার সকালে হোয়াইট হাউসে নির্মাণাধীন বলরুম সাংবাদিকদের দেখানোর সময় তিনি বলেন, ইরানের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতেই হয়েছে এবং দেশটি এখনো তা চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প জানান, বুধবার সকালে ভ্যান্সের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সেটিকে ‘ভালো’ বলে মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানি এ বিষয়ে সে কী অনুভব করে এবং আমার মনে হয়, এটা ঠিকই ছিল।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে—এমনটা তিনি জানতেন বলেও জানান ট্রাম্প। তবে নিজের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।
বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সংযমের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান নিয়ে আসা ভ্যান্স যুদ্ধ শুরুর পর সংঘাতের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেননি। এমনকি যুদ্ধ বন্ধের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।
ভ্যান্সের সামনে ডেমোক্র্যাটদের চাপ
ইরান যুদ্ধের জন্য ভ্যান্সকেও দায়ী করছে ডেমোক্র্যাটরা। এ বিষয়ে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে দলটি।
ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির মুখপাত্র রোজমেরি বোয়েগলিন এক বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলেন, ভ্যান্স যদি শুরু থেকেই যুদ্ধ নিয়ে এমন অবস্থানে থাকেন, তাহলে তিনি কেন জোরালোভাবে আপত্তি জানাননি বা পদত্যাগ করেননি? কেন তিনি আমেরিকানদের পক্ষে দাঁড়াননি?
বোয়েগলিন আরও বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট সব সময় নিজের জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান বেছে নেন, এমনকি তাতে আমেরিকানরা ঝুঁকির মুখে পড়লেও। তাঁর মতে, বর্তমান প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় ভ্যান্সেরও রয়েছে।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। দুই বছর আগে ট্রাম্প যেসব এলাকায় বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, রিপাবলিকান-সমর্থিত সেসব এলাকাতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।
পরাজয়ের কারণ নিয়ে ভ্যান্সের বক্তব্য
নিজের পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ইরান যুদ্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দেওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক—এসব বিষয় রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ইসরায়েল ইস্যুতেও ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কিছু মতপার্থক্য রয়েছে।
ভ্যান্স লেখেন, ‘আমাদের পরাজয়ের প্রকৃত কারণ প্রায় সবার কাছেই স্পষ্ট।’
ট্রাম্পের বিপরীতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পুনর্নির্বাচনের জন্য সমর্থন জানাননি ভ্যান্স। চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইসরায়েল সরকারের কয়েকজন সদস্যেরও সমালোচনা করেছিলেন তিনি। ওই সদস্যরা ইরান যুদ্ধের অবসানে ট্রাম্পের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছিলেন।
এ ছাড়া অভিবাসন নীতির কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভ্যান্স সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এসব অভিযান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
ভ্যান্স বলেন, অভিবাসন আইন প্রয়োগের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করতে আগ্রহী। উদাহরণ হিসেবে তিনি অবৈধ শ্রমিক নিয়োগকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তবে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারীদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারেন—এমন রাজনীতিকদের অবস্থান তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ভোটার জরিপ অনুযায়ী, এক লাখেরও বেশি মার্কিন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভুল ছিল।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোটারদের অধিকাংশ প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন। তবে জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটারের কাছে ইরান যুদ্ধ নির্বাচনের প্রধান ইস্যু ছিল না।
প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার বলেছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি দুর্নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রায় অর্ধেক ভোটার।
প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করা প্রায় সব ভোটারই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছেন। বিপরীতে, রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন করা প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার এ সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে অভিহিত করেছেন।
ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক মেরিন সেনা ভ্যান্স ওই যুদ্ধের সমালোচনা করেছিলেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন অতীতের মতো অনির্দিষ্টকালের সংঘাতে মার্কিন সেনাদের পাঠাবে না।

































