জ্বালানি নিরাপত্তায় পাঁচ বছরের পরিকল্পনা, গুরুত্ব পাচ্ছে এলএনজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি

জ্বালানি নিরাপত্তায় পাঁচ বছরের পরিকল্পনা, গুরুত্ব পাচ্ছে এলএনজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ২১:০৮, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা: দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর আওতায় নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৌশলগত ফ্রেমওয়ার্কে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী খুলনা ও বরিশালে দুটি নতুন এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ৪০০ মেগাওয়াটের একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী ও পায়রায় দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন অবকাঠামোর পাশাপাশি বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও চাহিদা
সরকারি পরিকল্পনায় আগামী বছরগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৬ শতাংশ হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে এবং ১৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন বিবেচনায় আগামী পাঁচ বছরে চাহিদা ২৫ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াটে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং জ্বালানি সরবরাহের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এতে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দক্ষতা বাড়াতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সংস্কার প্রয়োজন। তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজও একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্ব
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকায় সংস্থাটির ওপর দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক চাপ রয়েছে। সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন ব্যয় সামাল দেওয়া হচ্ছে।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫২ হাজার কোটি টাকা।

জ্বালানি খাতের সাবেক কর্মকর্তা মর্তুজা আহমদ ফারুক চিশতী বলেন, বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো কীভাবে আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যায়, সেটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।

এলএনজি আমদানি ও দেশীয় গ্যাস
দেশের গ্যাস চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানির ভূমিকা ইতোমধ্যে বেড়েছে। নতুন দুটি এফএসআরইউ নির্মাণ হলে আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তন দেশের জ্বালানি ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। দেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে। পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে এ গ্যাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাড়ছে গুরুত্ব
জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। নেট মিটারিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় পরিসরে কাজ করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিপিডিবি, পিজিসিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক মূলত আগামী পাঁচ বছরের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একটি গাইডলাইন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এর ভিত্তিতে পৃথক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে। বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সংস্কারের বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement