পাহাড়ের দুর্গম জনপদে ৪০ নারীর হাতে নতুন সম্ভাবনা
Published : ২১:০০, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সবুজ পাহাড় আর আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে বান্দরবানের প্রত্যন্ত জনপদে বসবাস করা মানুষের জীবন সহজ নয়। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং কৃষিনির্ভর জীবিকার কারণে অনেক পরিবারকে প্রতিনিয়ত নানা সংকট মোকাবিলা করতে হয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বহু পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস জুম চাষ। প্রকৃতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল এই আয়ে সারা বছর পরিবারের প্রয়োজন মেটানোও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
এর প্রভাব পড়ে পরিবারের নারী ও শিক্ষার্থীদের ওপরও। সীমিত আয় দিয়ে খাবার, চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেকেরই নিজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হয় না। অথচ তাঁদের অনেকেরই রয়েছে কাজ শেখার আগ্রহ এবং নিজের আয় দিয়ে পরিবারকে সহযোগিতা করার স্বপ্ন।
এমন কিছু স্বপ্নবাজ নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। সংগঠনটির উদ্যোগে বান্দরবানের আলীকদম ও সদর উপজেলার ৪০ জন অসচ্ছল নারীকে তিন মাসব্যাপী বিনা মূল্যে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি করে সেলাই মেশিন। ফলে প্রশিক্ষিত নারীদের জন্য নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করার একটি বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি আলীকদম ও বান্দরবান সদর উপজেলা হলরুমে আয়োজিত পৃথক অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহেদ পারভেজ, বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু, বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামানসহ স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
আলীকদম উপজেলার মারানপাড়ার চামমুম ম্রোর জীবন কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। তিন ভাই ও আট বোনের বড় পরিবারের এই তরুণী বর্তমানে আলীকদম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা রেংকাই ম্রো জুম চাষ করেন। সীমিত সেই আয় দিয়েই পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হয়।
ছোটবেলা থেকেই পরিবারের আর্থিক সংকট দেখেছেন চামমুম। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্যও পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হতো।
সেলাই প্রশিক্ষণ সেই বাস্তবতায় নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে একটি সেলাই মেশিনও পেয়েছেন তিনি।
চামমুম বলেন, পরিবারের সদস্য অনেক। বাবার জুম চাষের আয় দিয়ে সংসারের সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন। সেলাই শেখার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত। এখন পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহযোগিতা করতে চান।
তাঁর কাছে সেলাই মেশিনটি শুধু একটি যন্ত্র নয়, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি সুযোগ।
আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের লাইজু আক্তারের জীবনেও রয়েছে অভাব ও দায়িত্বের চাপ। লামা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ছয় বোনের একজন।
প্রায় ১৩ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তাঁর বাবা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। এরপর থেকেই পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। বাবার নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় বোনদেরই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়।
বড় বোনদের সহযোগিতায় লাইজুর পড়াশোনা চলছে। তবে নিজের প্রয়োজনের জন্য সবসময় পরিবারের ওপর নির্ভর করতে চান না তিনি। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের কিছু খরচ চালান।
এর মধ্যেই সেলাই শেখার সুযোগ পান লাইজু। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে একটি সেলাই মেশিনও পেয়েছেন তিনি। এখন টিউশনের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে আয় করার পরিকল্পনা করছেন।
লাইজুর আশা, নিজের আয় দিয়ে পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানোর পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে পারবেন।
বান্দরবান সদর উপজেলার রেনীং পাড়ার মাসিংচিং মার্মাও সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর একজন। লোটাস শিশু সদন আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর বাবা থোয়াইচিংনু মার্মা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি হিসেবে কর্মরত।
দুই বোনের পরিবারে সীমিত আয়ের মধ্যেই তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ ছিল মাসিংচিংয়ের।
সেলাই প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এখন তাঁর নিজের একটি মেশিনও রয়েছে। এই মেশিন ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আয় করতে চান তিনি। নিজের পড়াশোনার খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর স্বপ্ন।
বান্দরবান সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মেসাইনু মার্মার জীবনেও রয়েছে সংগ্রামের গল্প। তাঁর মা অনেক আগেই মারা গেছেন। বাবা সাবাই উ মার্মা কৃষিকাজ করে সংসার চালান।
বাবার সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করেই মেসাইনুর পড়াশোনা চলছে। পরিবারের আর্থিক বাস্তবতা তাঁকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কাজ শেখার সুযোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।
তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন পাওয়ায় এখন নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই করে আয় করে বাবার আর্থিক চাপ কিছুটা কমাতে চান তিনি।
এই উদ্যোগের আরেক উপকারভোগী শ্যামলী তঞ্চঙ্গ্যা বান্দরবান সরকারি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাবা কদম তঞ্চঙ্গ্যা খুব বেশি আয় করতে পারেন না। পরিবারের ব্যয় মেটাতে এনজিওতে কর্মরত ভাইয়ের আয়ের ওপরও নির্ভর করতে হয় তাঁদের।
এই বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন শ্যামলী। ভবিষ্যতে নিজের আয়ে পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ইচ্ছা তাঁর।
সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন পাওয়ার পর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি পথ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারলে পরিবারে আর্থিকভাবে অবদান রাখা সম্ভব হবে বলে আশা তাঁর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সেলাই মেশিন বিতরণ করলেই সেটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সবসময় সম্ভব হয় না। এ কারণে মেশিন দেওয়ার আগে নারীদের তিন মাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁরা সেলাইয়ের মৌলিক কাজ শেখার পাশাপাশি মেশিন ব্যবহারের বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।
আয়োজকদের মতে, সীমিত আয়, কর্মসংস্থানের অভাব এবং পারিবারিক নানা দায়িত্বের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক নারী আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পান না। তাঁদের একটি ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানোর পাশাপাশি সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর উপকরণ দেওয়া হলে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করা সহজ হয়।
আলীকদম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ ও মেশিন দেওয়ার উদ্যোগ সময়োপযোগী। এর মাধ্যমে নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবেন।
বান্দরবান সদর থানার ওসি মো. শাহেদ পারভেজও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন দেওয়া তাঁদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথে সহায়তা করবে।
বান্দরবান জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আমিনুল হক বাচ্চু বলেন, শুধু মেশিন বিতরণ নয়, তার আগে তিন মাসের বিনা মূল্যের প্রশিক্ষণ দেওয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে উপকারভোগীরা মেশিন ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করেছেন। ফলে সেলাই মেশিন তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যম হতে পারে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের অনেক নারী নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের সুযোগ পান না। তাঁদের দক্ষ করে তুলতে পারলে পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সেলাই মেশিন পাওয়া ৪০ নারীর বড় একটি অংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তাঁদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছেন। কারও বাবা জুম চাষ করেন, কারও বাবা কৃষিকাজ করেন, আবার কারও পরিবারে অসুস্থতা বা সীমিত আয়ের কারণে সংসার চালানোই কঠিন।
তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা হলেও স্বপ্ন প্রায় একই—পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, নিজের প্রয়োজনের কিছুটা নিজে মেটানো এবং সুযোগ পেলে পরিবারকে সহযোগিতা করা।
চামমুম, লাইজু, মাসিংচিং, মেসাইনু কিংবা শ্যামলী—প্রত্যেকের হাতে এখন একটি করে সেলাই মেশিন। কারও কাছে এটি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অবলম্বন, কারও কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ, আবার কারও কাছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম পুঁজি।
পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে ৪০ নারীর হাতে সেলাই মেশিন পৌঁছে দেওয়া তাই তাঁদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা কতটা এগিয়ে যেতে পারবেন, তা সময়ই বলবে। তবে শুরুটা হয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে।

































