সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে নতুন প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর

সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে নতুন প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ওপর ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি আন্তর্জাতিক ডেস্ক

Published : ২০:৫২, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ৬৬ বছর ধরে কার্যকর থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি বর্তমানে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। দুই দেশের পরিবর্তিত সম্পর্ক, বাড়তে থাকা পানির চাহিদা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিনের এই পানি সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানির ব্যবহারে পাকিস্তানের প্রধান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানি ব্যবহারে ভারত অধিকতর অধিকার পায়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্তে উভয় দেশকে একে অপরের নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

দুই দেশের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও চুক্তিটি দীর্ঘ সময় কার্যকর ছিল। এ কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটিকে দীর্ঘস্থায়ী আন্তঃসীমান্ত পানি সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির পাশাপাশি চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। নয়াদিল্লি জানায়, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত চুক্তির কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।

এর পর থেকেই চুক্তিটির আইনি অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা জোরালো হয়।

২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পাকিস্তানের আবেদনের পর চুক্তির আওতায় গঠিত সালিসি ট্রাইব্যুনাল সিন্ধু পানি চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত দেয়। এতে চুক্তিটি কার্যকর রয়েছে বলে বিবেচনা করা হয় এবং এর আওতায় বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে অবস্থান জানানো হয়।

তবে ভারত ওই সালিসি প্রক্রিয়ার এখতিয়ার নিয়ে ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। ফলে আদালত বা সালিসি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দুই দেশের নিজ নিজ অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সিন্ধু নদ অববাহিকা পাকিস্তানের কৃষি, সেচ ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কৃষি অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই নদীব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে ভারতও সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর পানি ব্যবহার করে বিভিন্ন সেচ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনা করছে। ফলে নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা দুই দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

চুক্তিতে দুই দেশের পানি ব্যবহারের অধিকার ও সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পানি সংক্রান্ত বিরোধ সমাধানের জন্য বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে দুই দেশের জনসংখ্যা ও পানির চাহিদা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং হিমবাহের পরিবর্তনও নদী অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ নীতি হলো, চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করতে হয়। তবে আন্তর্জাতিক আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তি স্থগিত, সংশোধন বা অন্যভাবে পরিবর্তনের বিষয়েও নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।

সিন্ধু পানি চুক্তির বর্তমান পরিস্থিতিতেও আইনি কাঠামোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কারণ পানি ব্যবস্থাপনা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। নদীর পানি প্রবাহ, বাঁধ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সেচ এবং কৃষি পরিকল্পনার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দুই দেশের পানি নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি নিয়ে বিরোধকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট থেকে আলাদা রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সিন্ধু পানি চুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ থাকলেও পানি ব্যবস্থাপনায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বজায় ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাঠামো কতটা কার্যকর রাখা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু কোনো আদালত বা সালিসি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক আস্থা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হলে পানি সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে প্রযুক্তি, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ পানি ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

৬৬ বছর ধরে টিকে থাকা সিন্ধু পানি চুক্তি তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু পানি বণ্টনের একটি চুক্তি নয়; দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনি কাঠামোর পাশাপাশি পারস্পরিক আস্থা, নিয়মিত সংলাপ এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতাই চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

 
শেয়ার করুনঃ
Advertisement