খাদ্য-পানির সংকটে লোকালয়ে নামছে গারো পাহাড়ের বন্য হাতি, বাড়ছে মানুষ-হাতির প্রাণঘাতী সংঘাত
Published : ১০:৫১, ২৬ জুলাই ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে বন উজাড় এবং পাহাড় কাটার কারণে গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে দ্রুত কমে যাচ্ছে বন্য হাতির খাদ্য ও পানির উৎস। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে গত দুই দশক ধরে হাতির দল বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত, অন্যদিকে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ ও বিলুপ্তপ্রায় এ বন্য প্রাণী।
প্রাণীবিদ, বন বিভাগ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর ও শেরপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত হাতির আক্রমণে এ অঞ্চলে ৪৯ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে মানুষের পাতা ফাঁদ, বিষটোপ ও বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মারা গেছে ৩৫টি বন্য হাতি।
বনে নেই খাবার, শুকিয়ে গেছে পানির উৎস
একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাদ্য এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানি প্রয়োজন হয়। তাদের প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে ঘাস, গাছের পাতা, ছাল, শিকড়, বাঁশের কচি কুঁড়ি ও বুনো কলাগাছ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় পাহাড়ে প্রচুর আমলকী, হরিতকী, বহেড়া, বুনো কলাসহ নানা প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ছিল। পাশাপাশি ঝিরি ও পাহাড়ি ঝরনায় সারা বছর পানি প্রবাহিত হতো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং পাহাড় ধ্বংসের কারণে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
ফলে খাদ্য ও পানির সন্ধানে হাতির দল বাধ্য হয়ে সমতলের কৃষিজমি ও বসতিতে প্রবেশ করছে। এতে ফসল, ঘরবাড়ি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের প্রাণহানিও ঘটছে।
শেরপুরেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শেরপুরে। সেখানে হাতির আক্রমণে ৩০ জন মানুষ এবং মানুষের কারণে ৩০টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া ময়মনসিংহে হাতির আক্রমণে মারা গেছেন ১০ জন, নেত্রকোনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন, আর সেখানে মারা গেছে দুটি হাতি। জামালপুরে হাতির আক্রমণে নিহত হয়েছেন ৪ জন, আর মানুষের কারণে মারা গেছে তিনটি হাতি।
কেন বাড়ছে হাতির মৃত্যু?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের তৈরি বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাই হাতির মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
ফসল রক্ষার জন্য সীমান্ত এলাকার অনেক কৃষক জমির চারপাশে জিআই তার দিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ দেন। রাতে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে আসা হাতিগুলো এসব বৈদ্যুতিক ফাঁদে আটকে প্রাণ হারায়।
অন্যদিকে পাহাড়ি ঝিরি শুকিয়ে যাওয়ায় হাতিরা পানির খোঁজে লোকালয়ের ডোবা বা পুকুরে নামে। অনেক সময় কাদায় আটকে যায় অথবা বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে মারা পড়ে।
এ ছাড়া হাতির প্রাচীন চলাচলের পথ বা করিডোর দখল করে বসতি ও কৃষিজমি গড়ে ওঠায় তারা পথ হারিয়ে মানুষের মুখোমুখি হচ্ছে, যা সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
স্থানীয়দের দাবি
শেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, আগে হাতি খুব কমই লোকালয়ে আসত। কিন্তু গত ১০ থেকে ১৫ বছরে এটি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
কৃষক রমজান আলী বলেন, "হাতির কোনো দোষ নেই। বনের ভেতরে ওদের খাবার ও পানি নেই বলেই লোকালয়ে আসে। কিন্তু মানুষও নিজের ফসল বাঁচাতে বিদ্যুতের ফাঁদ পাতে। এতে মানুষ ও হাতি—দুই পক্ষই প্রাণ হারাচ্ছে।"
আরেক কৃষক মো. আবদুর রশিদ বলেন, সম্প্রতি প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি হাতির একটি দল তার দুই বিঘা ধানখেত সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিয়েছে। তিনি বলেন, "হাতি শুধু ফসল খায় না, পায়ের নিচে পিষে সব শেষ করে দেয়। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ফসল রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বনের ভেতর হাতিদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে।"
বিশেষজ্ঞদের মতামত
প্রাণীবিদ ও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রোকোনুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র ভেঙে পড়েছে। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় পাহাড়ে নতুন গাছ জন্মাচ্ছে না, শুকিয়ে যাচ্ছে ঝিরি ও ছড়া। এতে হাতির স্বাভাবিক খাদ্য ও পানির উৎস ধ্বংস হচ্ছে এবং তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে নেমে আসছে।
বন বিভাগের উদ্যোগ
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বালিজুরী রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি বন্য হাতি রয়েছে।
বালিজুরী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া জানান, মানুষ-হাতির সংঘাত কমাতে প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির উপযোগী খাদ্যগাছের বাগান তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে প্রায় ৪০টি কৃত্রিম জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বন্য প্রাণীগুলো বনের ভেতরেই পর্যাপ্ত পানি পায়।
সমাধানের পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট মোকাবিলায় শুধু বনায়ন করলেই হবে না; হাতির খাদ্য হিসেবে উপযোগী বুনো কলা, বাঁশ, আমলকী, বহেড়া, কাঁঠালসহ স্থানীয় প্রজাতির গাছ ব্যাপকভাবে রোপণ করতে হবে।
পাশাপাশি বনের ভেতরে বড় আকারের কৃত্রিম জলাধার তৈরি, হাতির চলাচলের করিডোর পুনরুদ্ধার এবং লোকালয়ে উন্মুক্ত বৈদ্যুতিক তারের পরিবর্তে সৌরশক্তিচালিত নিরাপদ বৈদ্যুতিক বেষ্টনী স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে যেমন হাতির প্রাণহানি কমবে, অন্যদিকে মানুষ-হাতির দীর্ঘদিনের সংঘাতও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

































