তাজমিনের শেষ রাতের রহস্য, সিসিটিভি ফুটেজে মিলল নতুন তথ্য

তাজমিনের শেষ রাতের রহস্য, সিসিটিভি ফুটেজে মিলল নতুন তথ্য সিসিটিভির কিছু দৃশ্য, ইনসেটে জান্নাতুল তাজমিন। ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা ব্যুরো

Published : ১২:২৩, ৯ অক্টোবর ২০২৬

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। মৃত্যুর আগের রাতে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেল এলাকায় তার চলাচলের দৃশ্য ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। তবে ওই এলাকা ছাড়ার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। এরপর হোটেলের পাশের খাবারের দোকান ও পশ্চিম পাশের কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে।

ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু দেখানোর পর তাজমিন অন্য পাশে চলে যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এরপর তার চলাচলের আর কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সে কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কাছাকাছি পড়ে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের চার থেকে পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়। পাশে একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং কিছু দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। এসব আলামত দেখে স্থানীয়দের ধারণা, মৃত্যুর আগে সেখানে দৌড়াদৌড়ি বা ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে। তবে কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, সিএনজিটি পড়ে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি আশপাশের ধানক্ষেতে এলোমেলো গাছ দেখতে পান। পরে সেই চিহ্ন অনুসরণ করে একটি ধানক্ষেতে কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান। তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।

নিহতের বাবা আবদুল আলীম জানান, ৪ অক্টোবর তাজমিন কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে এক বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বের হয়। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায়। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় সে। রাতে মেয়েকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাননি তিনি।

আবদুল আলীমের ভাষ্য, বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে তাজমিন তাকে একটি বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে নিয়ে যেতে বলেছিল। তবে তিনি ঘুমিয়ে থাকায় সকালে বার্তাটি দেখেন। পরে লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করা হয়েছে। তাজমিনের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। কুমিল্লার সদর দক্ষিণ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন। সিআইডি ও পিবিআইসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। তাজমিনের চলাচলের পথ, জব্দ করা অটোরিকশা এবং সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় পরিবারের সঙ্গে থাকত সে এবং শহরের ফরিদা বিদ্যায়তনে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাবা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ বলছে, মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement