শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের তাগিদ

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের তাগিদ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ২১:২২, ২২ আগস্ট ২০২৬

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনগত বিষয় হলেও এর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভারত বিষয়টি নিজস্ব আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে। ফলে বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে পুরো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেও যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে এবং প্রায় ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে।

দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের জন্যও ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ সুতা আমদানি করেছে, যার বড় অংশ এসেছে ভারত থেকে। ব্যবসায়ীদের কাছে দ্রুত সরবরাহ, বড় চালান এবং তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামের কারণে ভারতীয় সুতার গুরুত্ব রয়েছে।

তবে একই সঙ্গে স্থানীয় বস্ত্রশিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কাঁচামালের বিকল্প উৎস তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা—দুই বিষয়কেই বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তাও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি এবং নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ব্যয়ও বাড়তে পারে।

দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার স্বার্থে এ বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা ও সহযোগিতা প্রয়োজন। গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়নসহ দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলাতেও দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। চোরাচালান, মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় উভয় দেশের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বহুমুখী করাও গুরুত্বপূর্ণ। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বহুমুখীকরণের অর্থ কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে দেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত করা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে তাই জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, সীমান্ত, নিরাপত্তা ও যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোতেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের সার্বিক স্বার্থ সুরক্ষা। কোনো একক রাজনৈতিক ইস্যু যেন বাণিজ্য, অর্থনীতি, জ্বালানি, পানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে বাধাগ্রস্ত না করে—এটাই হতে পারে বাস্তবভিত্তিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement