বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির আহ্বান
Published : ২১:৩৩, ২২ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভৌগোলিক অবস্থান, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে পারস্পরিক স্বার্থ, বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে, সেই সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়াই বাস্তবসম্মত কূটনীতির মূল লক্ষ্য হতে পারে।
ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে বাণিজ্যিক যোগাযোগ, নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মানুষের যাতায়াত। ফলে কোনো একটি ইস্যুতে মতপার্থক্য তৈরি হলেও সামগ্রিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ভারতীয় বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বও রয়েছে। শিল্প ও উৎপাদন খাতে বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে ভৌগোলিক নৈকট্য সুবিধা তৈরি করে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ট্রানজিট ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারত, নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাজারের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারে।
তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্য, পানির ন্যায্য হিস্যা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং মানুষের নিরাপদ যাতায়াতের মতো বিষয়ে বাংলাদেশকে নিয়মিত ও কার্যকর কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ছাড়াও চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য দেশের বিকল্প হিসেবে না দেখে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিটি সম্পর্ক পরিচালনা করাই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পথ।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। সীমান্ত অপরাধ, মানব পাচার, চোরাচালান এবং আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যুতে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় দুই দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে মতপার্থক্য যেন বৃহত্তর সহযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সমঝোতা খোঁজা একটি কার্যকর কূটনৈতিক পদ্ধতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য ভারতবিরোধিতা কিংবা অতিরিক্ত নির্ভরতা—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো, বাণিজ্যিক বৈচিত্র্য তৈরি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য তাই পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক সম্মান ও সমান স্বার্থের ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে ভবিষ্যৎ কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।































