আবারও গ্যাস-সংকটে চট্টগ্রাম, চুলায় আগুন নেই বাসাবাড়িতে; ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

আবারও গ্যাস-সংকটে চট্টগ্রাম, চুলায় আগুন নেই বাসাবাড়িতে; ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১৩:৪৪, ১২ আগস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামে আবারও তীব্র গ্যাস-সংকট দেখা দিয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে বা পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে দুপুর পর্যন্ত অনেক পরিবার রান্না করতে পারেনি। একই সঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।

নগরের হালিশহরের বাসিন্দা শারমিন আক্তার জানান, সকাল ৮টার পর থেকে তাঁর বাসায় চুলায় গ্যাস নেই। দুপুর গড়িয়ে গেলেও রান্না করতে পারেননি তিনি। হঠাৎ করে আবার গ্যাস-সংকট দেখা দেওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে জানান এই বাসিন্দা।

শুধু হালিশহর নয়, চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারাই একই সমস্যায় পড়েছেন। বাসাবাড়ির পাশাপাশি সংকট দেখা দিয়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও।

ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা

বুধবার নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে গ্যাসচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। চালকদের অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না।

ষোলোশহরের ফসিল ফিলিং স্টেশনে সকাল ৭টা থেকে গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়ান সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ নোমান। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্তও তিনি গ্যাস পাননি।

তিনি জানান, টাইগারপাসসহ নগরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়েও গ্যাস পাওয়া যায়নি। ফসিল ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ থাকলেও চাপ কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অটোরিকশা, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন সেখানে সারিবদ্ধ হয়ে আছে।

চাহিদার অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি

কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত থেকে চট্টগ্রামে হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।

আজ চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে। অথচ নগর ও আশপাশের এলাকায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট।

অর্থাৎ চট্টগ্রামে দৈনিক চাহিদার প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এবার সংকটের কারণ বৈরী আবহাওয়া

সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে চট্টগ্রামে গ্যাস-সংকট তৈরি হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. শোয়েব জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী একটি জাহাজ মহেশখালীর টার্মিনালে ভিড়তে পারছে না।

তিনি জানান, টার্মিনালে নিরাপদে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতির নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বাতাসের গতি ২০ নটের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বাতাসের গতি প্রায় ৩৮ নট। ফলে নিরাপত্তার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

জাহাজ ভিড়লেই বাড়বে সরবরাহ

বর্তমানে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৪০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

এলএনজিবাহী জাহাজটি টার্মিনালে ভিড়তে পারলে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ৭৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা মো. শোয়েব।

তিনি বলেন, আগেরবার একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের বয়লারে যে সমস্যা হয়েছিল, সেটি এখন বর্তমান সংকটের মূল কারণ নয়। নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে ভেড়ানোর পর সরবরাহ বাড়ানো হবে।

কয়েক দিন আগেও ছিল তীব্র সংকট

এর আগে মাত্র কয়েক দিন আগেও গ্যাসের জন্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল চালকদের। কেউ কেউ গাড়িতেই রাত কাটিয়েছেন। চার থেকে আট ঘণ্টা লাইনে থেকেও অনেকে গ্যাস পাননি।

পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার চালু হলে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। কমে আসে ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইনও।

তবে সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মঙ্গলবার রাত থেকে সরবরাহ আবার কমে যাওয়ায় বুধবার নতুন করে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি দেখা দিয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় প্রতিটি গাড়িতে গ্যাস ভরতেও বেশি সময় লাগছে।

স্বস্তি এখন আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল

কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই দুটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।

গত ২১ জুলাই একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাবে চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস-সংকট তৈরি হয়। একপর্যায়ে দৈনিক সরবরাহ ১৮ থেকে ১৯ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।

পরে একটি বয়লার চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে ভিড়তে না পারায় আবারও সরবরাহ কমেছে।

কেজিডিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার সংকট কাটার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করছে মহেশখালীর আবহাওয়ার ওপর। বাতাসের গতি কমে এলএনজিবাহী জাহাজটি নিরাপদে টার্মিনালে ভিড়তে পারলেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাসের ঘাটতি নিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement