সুশীলদের বিবৃতি ঘিরে জনমনে নতুন প্রশ্ন

সুশীলদের বিবৃতি ঘিরে জনমনে নতুন প্রশ্ন ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি

Published : ২০:২৩, ১ অক্টোবর ২০২৬

দেশে অন্যায়, অনিয়ম, দখল, হামলা কিংবা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক বিষয়। রাষ্ট্রের ভুলত্রুটি তুলে ধরা, নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানানো তাঁদের নাগরিক ভূমিকার অংশ। তবে একই ধরনের ঘটনায় তাঁদের অবস্থান সবসময় একই রকম কি না—সাম্প্রতিক দুটি বিবৃতিকে ঘিরে সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ৩৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও তাঁদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
অন্যদিকে একই সময়ে রাজধানীর বাংলাবাজারে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) শোরুমে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে হামলা ও বিক্রয়কর্মীদের হয়রানির অভিযোগের ঘটনায় ৩৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও বই বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
দুটি বিবৃতির বিষয়বস্তু আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই নাগরিক অধিকার, আইনশৃঙ্খলা ও মতপ্রকাশের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের একটি অংশ।
একই মানদণ্ডে অবস্থান কি?
এখানেই সামনে আসে আরও বড় প্রশ্ন—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে প্রকাশিত উদ্বেগ কি কেবল বর্তমান পরিস্থিতিকে ঘিরে, নাকি অতীতের একই ধরনের ঘটনাতেও একই ধরনের অবস্থান নেওয়া হয়েছিল?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দখল, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব-সক্রিয়তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে। বিভিন্ন সরকারের সময়ই এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার পরিবর্তে ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও আগের সময়ের অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত নানা সমস্যার প্রভাব রয়ে গেছে। অল্প সময়ে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে বর্তমান সময়ে সংঘটিত অপরাধ বা অনিয়মের দায়মুক্তিও গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়।
এই বাস্তবতায় সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
সমালোচনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক শক্তির কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলে একই ধরনের অভিযোগ অন্য সময় বা অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে উঠলে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না—সেটিও জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হতে পারে।
তবে কোনো ব্যক্তি কোনো ঘটনায় বিবৃতি দেননি বলেই তিনি সেই ঘটনার সমর্থক ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে কোনো ঘটনায় বিবৃতি দেওয়াও নিজে থেকে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ নয়। কারও অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য, কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অতীতের ঘটনাগুলোও কি আলোচনায় আসবে?
সাম্প্রতিক সময়ে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিকে কেন্দ্র করে ঘটনাটির বিরুদ্ধে ৩৬ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই কেউ কেউ অতীতে অনুরূপ ঘটনা নিয়ে তাঁদের অবস্থান কী ছিল, তা জানতে চাইছেন। বিশেষ করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনাগুলো নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া কতটা দৃশ্যমান ছিল—সেটিও আলোচনার অংশ হতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট ঘটনায় বিবৃতি দিয়েছেন কি না, তা যাচাই ছাড়া তাঁর অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বিবৃতির বিষয়, সময় ও স্বাক্ষরকারীদের তালিকাও আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ফিরে আসে ‘এক-এগারো’র প্রসঙ্গ
সুশীল সমাজের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ২০০৬–০৭ সালের রাজনৈতিক সংকটও সামনে আসে। ওই সময় রাজনৈতিক বিরোধ, সহিংসতা, হরতাল-অবরোধ এবং নির্বাচন নিয়ে সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং পরদিন ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ সময় ‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত।
ওই সময় নাগরিক সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন হয়েছে। কেউ তাঁদের ভূমিকা দেখেছেন রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার প্রচেষ্টা হিসেবে, আবার কেউ মনে করেছেন, এর ফলে রাজনীতির বাইরে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
তবে ২০০৬–০৭ সালের পরিস্থিতি এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তখনকার রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বর্তমান সময়ের সঙ্গে অভিন্ন নয়। তাই কিছু মিলের ভিত্তিতে দুই সময়কে একই পরিকল্পনা বা একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ হবে না।
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য ও অবস্থান বিশ্লেষণে
সুশীল সমাজের সাম্প্রতিক সরব হওয়ার পেছনে কেবল নাগরিক উদ্বেগ কাজ করছে, নাকি এর সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে এর উত্তর অনুমানের মাধ্যমে নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্য বক্তব্য, বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বিবৃতি, তাঁদের কর্মকাণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমে খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার যেমন জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না, তেমনি নাগরিক সমাজের সমালোচনাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সরকারকে প্রশ্ন করা নাগরিক সমাজের অধিকার; একই সঙ্গে নাগরিক সমাজের অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে জনগণের প্রশ্ন করাও স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ অতীতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সহিংসতা, জরুরি অবস্থা এবং অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘ শাসনের মতো বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে নতুন কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকট তৈরি হলে জনগণ অতীতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করবে—এটাই স্বাভাবিক।
এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অপরাধ বা অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সুশীল সমাজ এসব বিষয়ে কথা বললে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তাদের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাব নিয়ে জনআলোচনাও স্বাভাবিক। বিশেষ করে একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে অবস্থানের ধারাবাহিকতা কতটা ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর তাঁদের প্রকাশ্য রেকর্ড থেকেই খুঁজে দেখা যেতে পারে।
সাম্প্রতিক দুটি বিবৃতি তাই শুধু দুটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে নয়; বাংলাদেশের সুশীল সমাজের ভূমিকা, অবস্থানের ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক সংকটে তাদের দায়িত্ব নিয়েও বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement