ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা ডিএনসিসি প্রশাসকের
Published : ১৮:৩৪, ১ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চলমান উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মিরপুর-১০ এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসব কথা বলেন ডিএনসিসি প্রশাসক। তিনি জানান, অভিযানে বাধা ও হামলার ঘটনায় পুলিশ এবং ডিএনসিসির পক্ষ থেকে পৃথক মামলা করা হবে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
শফিকুল ইসলাম খান বলেন, নগরবাসীর চলাচলের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত করার কার্যক্রম চলমান থাকবে। কারও ইন্ধনে পুনরায় ফুটপাত দখলের চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মিরপুর-১০ এলাকায় কয়েক দিন ধরে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে ডিএনসিসি। এর আগে ২৬ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ ফলপট্টি এলাকায় শতাধিক অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।
অভিযান পরিদর্শনের সময় ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ফুটপাত মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য। সেখানে অবৈধ দোকান বা স্থাপনা তৈরি করে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। তিনি মিরপুরের বাসিন্দাদের সহযোগিতাও কামনা করেন।
মিরপুর-১০ গোলচত্বর ও ফুটওভার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদের পর সড়ক ও পথচারীদের চলাচলের জায়গা পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ডিএনসিসি জানিয়েছে। ভবিষ্যতে উচ্ছেদ করা অন্যান্য জায়গাতেও পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
হকারদের বিষয়ে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট স্থানে বিকল্পভাবে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ফুটপাতের ওপর পুনরায় দোকান বসানোর বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান কঠোর।
ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, প্রয়োজনে তাঁর লাশের ওপর দিয়েও ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল এবং হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আপনার দেওয়া অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গাউছিয়া, ধানমন্ডি, গুলশান, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, আগারগাঁও, ফার্মগেট, রামপুরা, মগবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
কিছু এলাকায় দোকানপ্রতি দৈনিক ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ, আলো বা অন্যান্য সেবার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম জড়িয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া কাউকে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
শুধু উচ্ছেদ নয়, স্থায়ী ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, শুধু ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা হকারদের সরিয়ে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর মতে, ফুটপাত দখলের পেছনে অর্থ আদায় বা প্রভাবশালী কোনো চক্র থাকলে তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তিনি নির্দিষ্ট এলাকা ও সময়ে হকারদের ব্যবসার সুযোগ, হলিডে মার্কেট ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেও ফুটপাত দখল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও বাজার এলাকায় স্মার্ট সিসিটিভি, এআইভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স এবং জিআইএসভিত্তিক ডিজিটাল ম্যাপ ব্যবহার করে নতুন দখল দ্রুত শনাক্ত করা যেতে পারে। নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য অ্যাপ বা হটলাইন চালুরও পরামর্শ রয়েছে।
রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়টি তাই শুধু উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে পথচারীদের চলাচল, হকারদের জীবিকা, অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাব এবং নগর ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক বিষয় জড়িত।
ডিএনসিসি এখন যে বিষয়টির ওপর জোর দিচ্ছে তা হলো—উচ্ছেদ অভিযানের পর ফুটপাত যেন আবার দখলে না যায়। মিরপুর-১০-এর সাম্প্রতিক অভিযানের পর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং নিয়মিত নজরদারি এই কার্যক্রম কতটা স্থায়ী হয়, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।































