জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে পরিকল্পনার ঘাটতি: নাহিদ

জ্বালানি সংকটের নেপথ্যে পরিকল্পনার ঘাটতি: নাহিদ ছবি: সংগৃহীত

বিজনেস ডেইলি ডেস্ক

Published : ১০:১১, ১৩ আগস্ট ২০২৬

পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সময়মতো জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণেই দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে সংকটকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

বুধবার (১২ আগস্ট) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি জনগণের সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সরকার অলিগার্কদের স্বার্থ রক্ষার পথে এগোচ্ছে। তার দাবি, নির্বাচনি ইশতেহারে ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’ এবং নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির কথা বলা হলেও ছয় মাসের মধ্যেই সরকার সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত পথে হাঁটছে।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারিকরণের নামে নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের সময়ে কুইক রেন্টাল ও আইপিপির মাধ্যমে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও বিএনপি তখন এর বিরোধিতা করেছিল। এখন একই ধরনের নীতির দিকে সরকার এগোচ্ছে বলে অভিযোগ তার।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাসের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারজাতের অনুমতি চাওয়ার বিষয়টি এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) চার দিনের মধ্যে ‘বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া জমা দিতে বলেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, এতে আপত্তি জানানোর পর বিপিসির চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার প্রশ্ন, জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতিমালা তৈরিতে এত কম সময় দেওয়ার কারণ কী।

তিনি আরও বলেন, ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ের জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করেছে। তার আশঙ্কা, এতে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে প্রতিযোগিতা হ্রাস, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং চলছে। তিনি জানান, ১০ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগে ৯ আগস্ট ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং ৩ আগস্ট ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকারও দাবি করেন তিনি।

সরকার বিদ্যুৎ সংকটের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে দায়ী করলেও সেটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল।

জ্বালানি সংকটের আরেকটি কারণ হিসেবে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন তিনি। নাহিদ ইসলামের দাবি, ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউতে আগুন লাগার পর দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ৫ আগস্ট আংশিক সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়।

এ ঘটনায় স্বাধীন কারিগরি তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাত জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ খাতে ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।

সংকট মোকাবিলায় তিনি ১৫ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে আবার ৪২ দিনে ফিরিয়ে নেওয়া, বিপিসির জ্বালানি ক্রয় শিডিউল দ্রুত অনুমোদন এবং পরবর্তী কয়েকটি প্রান্তিকের জন্য আগাম ক্রয় ক্যালেন্ডার প্রকাশ।

এ ছাড়া মহেশখালীর এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, গ্যাস বরাদ্দে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা, ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা, আইপিপির বকেয়া ও বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি আইন নিয়ে পুনর্বিবেচনা, স্মার্ট মিটার চালু এবং এলপিজি ও এলএনজি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন তিনি।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে প্যানেল, কনভার্টার ও ব্যাটারির ওপর শুল্ক কমানো, নেট মিটারিং ও ফিড-ইন ব্যবস্থাকে কার্যকর করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণেরও প্রস্তাব দেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে সংকট তৈরি করা এবং পরে বেসরকারি গোষ্ঠীর কাছে খাত হস্তান্তরের প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের প্রথম দায়িত্ব জনগণের প্রতি, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতি নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভুল সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা ও অলিগার্ক তোষণের বিরুদ্ধে এনসিপি অবস্থান নেবে বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করুনঃ
Advertisement