কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া ১৮ শতাধিক বাংলাদেশিকে বিশেষ ফ্লাইটে ফেরানোর দাবি
Published : ১৭:৪৭, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
কম্বোডিয়ার বিভিন্ন অনলাইন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে আটকে পড়া এবং মানবপাচার, প্রতারণা ও জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হওয়া ১৮ শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিককে বিশেষ ফ্লাইটে দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সংগঠনটির সভাপতি আল আমিন নয়নের স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, অনেক বাংলাদেশি বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেলেও প্রতিশ্রুত চাকরির পরিবর্তে বিভিন্ন অনলাইন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের অনেকে প্রতারণামূলক নিয়োগ, জবরদস্তি, ভয়ভীতি, চলাচলে বাধা, পাসপোর্ট আটকে রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তির বিনিময়ে অর্থ দাবির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংগঠনটির মতে, এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত প্রতারণার বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন, মানবপাচার প্রতিরোধ, নাগরিক সুরক্ষা এবং নিয়োগব্যবস্থার জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকারি ছাড়পত্র ও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিদেশে যাওয়ার পরও কেউ মানবপাচারের শিকার হলে নিয়োগ, ঝুঁকি নিরূপণ ও নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের ভাষ্য, এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আগাম দায়ী করার জন্য নয়; বরং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের জন্য।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কম্বোডিয়ায় ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণজনিত জরিমানা মওকুফের সুযোগ থাকলেও আর্থিক সংকট, বিমান টিকিটের উচ্চমূল্য, পাসপোর্ট ও ট্রাভেল পাসসংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক বাংলাদেশি দেশে ফিরতে পারছেন না।
অনির্বাণের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে জরিমানা মওকুফের আওতায় দেশে ফেরার জন্য আবেদনকারী ১ হাজার ৭৯৭ জনের তালিকা কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে বলে জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে আবেদন করতে না পারা আরও ৪০০-এর বেশি বাংলাদেশি একই ধরনের সংকটে রয়েছেন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটি বলেছে, ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা সামনে রেখে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আর বিলম্ব করা উচিত নয়। আটকে পড়া বাংলাদেশিদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি সংগ্রহে সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে জরুরি কূটনৈতিক সমন্বয়ের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরতে না পারা ব্যক্তিদের জন্যও বিকল্প প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন প্রত্যাবাসিত প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, বাধ্যতামূলক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অন্যান্য ধরনের শোষণের শিকার হওয়ার বিষয়টি যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, পাচারকারী বা জবরদস্তিকারীদের নিয়ন্ত্রণে থেকে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করলে মানবপাচারের বাস্তবতা উপেক্ষিত হতে পারে। তাই তাঁদের ক্ষেত্রে মানবপাচার-সংবেদনশীল তদন্ত, যথাযথ আইনি মূল্যায়ন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অ-শাস্তি নীতি অনুসরণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে নিরাপদ অভ্যর্থনা, খাবার, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, প্রয়োজনীয় যাতায়াত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশে সক্রিয় সম্ভাব্য মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়োগকারী সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া বৈধ সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় গিয়ে মানবপাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ঘটনা পর্যালোচনা করে নিয়োগকর্তা যাচাই, কর্মস্থল পরিদর্শন, চাকরির চুক্তি, বেতন, আবাসন এবং গন্তব্য দেশের ঝুঁকি নিরূপণপ্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছে তারা। ভবিষ্যতে কম্বোডিয়া ও অন্যান্য উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্যে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ অভিবাসনবিষয়ক জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
**সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত অনির্বাণ**
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের নেতৃত্বাধীন সংগঠন হিসেবে অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, প্রয়োজন নিরূপণ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে রেফারেল, পুনর্বাসন পর্যবেক্ষণ এবং নীতিগত দুর্বলতা চিহ্নিত করার কাজে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে তারা প্রস্তুত।
সংগঠনটির সভাপতি আল আমিন নয়ন বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নাগরিকদের বৈধভাবে পাঠানোই যথেষ্ট নয়; তাঁদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নাগরিক বিদেশে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা, সুরক্ষা দেওয়া, পুনর্বাসন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বিবৃতিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে, সারভাইভার হিসেবে তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে এবং মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশিদের পাচারের শিকার হওয়ার সুযোগ তৈরি করা ব্যবস্থাগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
অনির্বাণের আহ্বান, আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে, সারভাইভার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাঁদের পুনর্বাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাংলাদেশি একইভাবে মানবপাচারের শিকার না হন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।




























