বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই পদ?
Published : ১০:৩৫, ১০ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব, ক্ষমতা এবং বাস্তবে এই পদের ভূমিকা নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকও করেছে। যদিও বর্তমান সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পদটি অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়।
সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু?
১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে এবং রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অন্যদিকে সংসদ আহ্বান, স্থগিত বা ভেঙে দেওয়া, বিলে সম্মতি, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সরাসরি ক্ষমতা খুবই সীমিত। তার মতে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সিদ্ধান্তই রাষ্ট্রপতির অধিকাংশ সাংবিধানিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে মূল নিয়ামক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় সরকারের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ রাষ্ট্রপতির জন্য সীমিত।
বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ে?
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাভাবিক সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় এই পদটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও এর একাধিক নজির রয়েছে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের মধ্যে বিরোধের জেরে দেশে সামরিক অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
একইভাবে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তার নিরপেক্ষ অবস্থানের জন্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে তার বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যও তৈরি হয়েছিল।
২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী মাত্র সাত মাস দায়িত্ব পালনের পর পদত্যাগ করেন। তার সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হলে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের আলোচনাও সামনে আসে।
২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে রাজনৈতিক সংকটের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। পরে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পর তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয় এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।
একসময় রাষ্ট্রপতিই ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদ সবসময় আনুষ্ঠানিক ছিল না। স্বাধীনতার পর মুজিবনগর সরকারের কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা ছিল। ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়।
তবে ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় ফিরে যায় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলেও রাষ্ট্রপতির হাতেই নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর পর থেকেই রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রয়োগ অনেকাংশেই নির্ভর করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীন অবস্থানের ওপর।


































